প্রায় ৫৪ বছর পর আবার চাঁদের পথে পা বাড়িয়েছে মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে নাসার ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস-২’ মহাকাশ অভিযান। চার নভোচারীকে নিয়ে চাঁদ প্রদক্ষিণ করবে এই মিশন, যা মানবজাতিকে আবারও চাঁদে পাঠানো এবং শেষ পর্যন্ত মঙ্গল গ্রহে অভিযানের বৃহৎ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বুধবার (স্থানীয় সময়) ৩২ তলা উঁচু এই রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। মুহূর্তটির সাক্ষী হতে লক্ষাধিক মানুষ জড়ো হন। আর্টেমিস-২ ক্রুরা হলেন নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কখ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। তারা প্রায় ১০ দিনব্যাপী এই অভিযানে চাঁদ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরবেন। উৎক্ষেপণের পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ক্যাপসুল থেকে কমান্ডার ওয়াইজম্যান বলেন, “আমরা একটি সুন্দর চাঁদোদয় দেখতে পাচ্ছি, আমরা ঠিক তার দিকেই এগোচ্ছি।”
উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। রকেটে হাইড্রোজেন জ্বালানি ভরার সময়টি ছিল অত্যন্ত জটিল। এর আগে এক কাউন্টডাউন পরীক্ষায় বিপজ্জনক ফাঁস ধরা পড়েছিল, যা উৎক্ষেপণ দীর্ঘ পেছাতে বাধ্য করেছিল। তবে এবার নাসার স্বস্তির বিষয় ছিল, তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। উৎক্ষেপণ দল সফলভাবে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটে সাত লাখ গ্যালনের বেশি জ্বালানি ভরাতে সক্ষম হয়।
উৎক্ষেপণের আগে আরও কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করতে হয় নাসাকে। রকেটের ফ্লাইট-টার্মিনেশন সিস্টেমে সংকেত যেতে সমস্যা হচ্ছিল—যে ব্যবস্থাটি রকেট পথচ্যুত হলে ধ্বংসের সংকেত পাঠায়। তা দ্রুত সমাধান করা হয়। এছাড়া অরিয়ন ক্যাপসুলের লঞ্চ-অ্যাবোর্ট সিস্টেমের ব্যাটারিতে তাপমাত্রা প্রত্যাশিত সীমার বাইরে চলে গেলে সেটিও ঠিক করে ফেলা হয়।
অভিযানের প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা উচ্চ-পৃথিবী কক্ষপথে থাকবেন এবং অরিয়ন মহাকাশযানের লাইফ-সাপোর্ট, প্রোপালশন ও নেভিগেশন সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পরীক্ষা করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বার্নের মাধ্যমে যানটি পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে চাঁদের পথে যাত্রা করবে। কয়েক দিনের এই যাত্রায় তারা পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকবেন।
অরিয়ন তারপর ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টোরি’ নামক পথে চাঁদের পেছন দিয়ে যাবে, যেখানে চাঁদ ও পৃথিবীর মহাকর্ষ বল যানটিকে স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনবে। এই ধাপে যানটি পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরত্বে অবস্থান করবে। চাঁদ প্রদক্ষিণ শেষে নভোচারীরা আবার কয়েক দিন পৃথিবীতে ফিরবেন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশকালে ক্যাপসুলটির গতিবেগ হবে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার, এবং এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে, যেখানে উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের গ্রহণ করবে।
নাসার অ্যাপোলো নভোচারীরা যখন শেষবার চাঁদে হেঁটেছিলেন, তখন বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ জন্মগ্রহণ করেনি। তাই আর্টেমিস মিশনকে উপস্থাপন করা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের চন্দ্রাভিযান হিসেবে। নাসার বিজ্ঞান মিশন প্রধান নিকি ফক্স এ প্রসঙ্গে বলেন, “অনেক মানুষ আছেন যারা অ্যাপোলো মনে রাখেন না। এমন প্রজন্ম আছে যারা অ্যাপোলো উৎক্ষেপণের সময় জন্মগ্রহণ করেনি। এই মিশনটিই তাদের অ্যাপোলো।”

