টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণ
ইরান যুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ‘জয়ী’ রাশিয়া
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করলেও পরিস্থিতির মধ্যে একটি দেশ তুলনামূলকভাবে লাভবান অবস্থানে উঠে এসেছে—রাশিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে অন্যান্য দেশ যুদ্ধের সরাসরি খরচ বহন করলেও রাশিয়া অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক সম্পৃক্ততা—এই তিনটি কারণ রাশিয়ার জন্য পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে অনুকূল করে তুলেছে।
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর হামলার তীব্র সমালোচনা করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-এর হত্যাকাণ্ডকে “নিষ্ঠুর ও নিন্দনীয়” বলে মন্তব্য করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর গবেষক রবার্ট পারসনের মতে, ইরান যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদে রাশিয়ার স্বার্থেই কাজ করতে পারে। তার মতে, প্রথমত যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়ছে, যা বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়ার জন্য লাভজনক। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র আবারও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তেল রপ্তানিতে মূল্যসীমা, সম্পদ জব্দ এবং বিভিন্ন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মস্কোর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানির বাজারে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জ্বালানি পণ্যের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া প্রতি ব্যারেল তেল ছাড় দিয়ে বিক্রি করছিল। কিন্তু এখন বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সেই তেল তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
এই সংঘাতের আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপরও। ইউক্রেন ইতোমধ্যেই মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা-এর ঘাটতিতে ভুগছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় একই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহৃত হওয়ায় ইউক্রেনের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা কমিশনার আন্দ্রিউস কুবিলিয়াস।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর সেই পরিবর্তনের শুরুতেই, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে, রাশিয়া নিজেকে একটি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে দেখতে পাচ্ছে।

