Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন

মাথা পড়ে গেলেও লড়াই চালিয়ে যায় দেহ: যেভাবে কাজ করে ইরানের যুদ্ধযন্ত্র

Icon

ইকোনমিক টাইমস

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

মাথা পড়ে গেলেও লড়াই চালিয়ে যায় দেহ: যেভাবে কাজ করে ইরানের যুদ্ধযন্ত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভূতপূর্ব সামরিক চাপের মুখে এখন টিকে থাকার লড়াই লড়ছে ইরান। সাম্প্রতিক সমন্বিত হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করা হয়েছে। এতে দেশটি গভীর সংকটে পড়েছে।

এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, ইরানের সামরিক কৌশল এখন মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।

তেহরানের প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে আছে একটি সামরিক নীতি, যার নাম ‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’। বহু বছর ধরে এই কৌশল তৈরি করা হয়েছে, যদিও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে এর ব্যবহার খুব কমই দেখা গেছে। এটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনো পদক্ষেপ নয়। প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং অসম যুদ্ধের তত্ত্ব থেকে এই নীতির বিকাশ ঘটেছে।

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস হলেও ইরানের সামরিক বাহিনী কার্যকর ও অপ্রত্যাশিতভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচি গতকাল এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই কৌশলের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরাজয় আমরা দুই দশক ধরে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমরা আমাদের কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমাদের রাজধানীতে বোমা হামলা হলেও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতায় কোনো প্রভাব পড়েনি। ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স আমাদেরকে ঠিক করতে দেয়, কখন এবং কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ হবে।’

২০০০ সালের শুরুর দিক থেকেই ইরানের সামরিক নীতিতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে স্থিতিশীলতা ও টিকে থাকার ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নামে পরিচিত এই ধারণা প্রায় ২০০৫ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ পায়। এরপর থেকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং তাদের মিত্র বাহিনীগুলোর পুনর্গঠনে এই নীতিই পথ দেখিয়েছে।

এই কৌশলের মূল দর্শন হলো, এমন কোনো একক কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থাকবে না যাকে নির্ভুল হামলার মাধ্যমে ধ্বংস করা যায়। তার বদলে পুরো কমান্ড কাঠামোকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তেহরানসহ ইরানের প্রতিটি প্রদেশ মিলিয়ে মোট ৩১টি আঞ্চলিক ইউনিট তৈরি করা হয়েছে।

এই ইউনিটগুলোকে এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে যাতে যুদ্ধের সময় তারা রাজধানীর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে স্বাধীনভাবে অভিযান চালাতে পারে। প্রয়োজনীয় অস্ত্র, জনবল এবং প্রশিক্ষণ তাদের কাছে আগে থেকেই রয়েছে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জার্নাল অব মিলিটারি স্টাডিজে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই নীতির লক্ষ্য হলো সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করা এবং প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানো।

কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে এবং সরাসরি মুখোমুখি বড় যুদ্ধ এড়িয়ে ইরান এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে প্রতিপক্ষকে বারবার বিভিন্ন স্তরের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, শহরের জটিল পরিবেশ এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এই প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০০৮ সাল থেকেই গড়ে ওঠা এই ৩১টি আঞ্চলিক কমান্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট—তেহরানের নেতৃত্ব ধ্বংস হলেও পুরো সামরিক বাহিনীতে যেন বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়।

এই ‘মোজাইক ডিফেন্স’ ইরানের নিরাপত্তা চিন্তায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রচলিত প্রতিরোধের বদলে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অসম কৌশল, ধীরে ধীরে ক্ষয় ঘটানো এবং প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার ধারণাকে।

ইরানের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ইরাক, আফগানিস্তান এবং বলকান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের ধারণা, প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী বাহিনীও বিপাকে পড়ে যখন তারা বিকেন্দ্রীকৃত গেরিলা হামলা, অস্পষ্ট যুদ্ধরেখা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের মুখে পড়ে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জার্নালের গবেষণাতেও একই কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানে আক্রমণ চালাতে গেলে কোনো বাহিনীকে দ্রুত জয় নয়, বরং ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহ, কঠিন ভূপ্রকৃতি এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে।

ইরানের ভূগোলও এই কৌশলকে শক্তিশালী করে। দেশটিতে আছে শুষ্ক মরুভূমি, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং দীর্ঘ উপকূলরেখা। এসব বৈশিষ্ট্য বড় আকারের সামরিক অভিযানকে কঠিন করে তোলে। ‘মোজাইক ডিফেন্স’ এই ভৌগোলিক বাস্তবতাকেই কৌশলের অংশ করেছে।

এই কাঠামোর ইরানের ‘প্যাসিভ ডিফেন্স’ ধারণার সঙ্গেও মিল আছে। এখানে দ্রুত আক্রমণ করে জয়ের বদলে গুরুত্ব দেওয়া হয় আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা এবং চাপের মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে।

বর্তমান সংঘাতে এই ‘মোজাইক ডিফেন্স’ বাস্তবে কার্যকর হতে শুরু করেছে। শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার পরও ইরান বিভিন্ন আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং কিছু আরব দেশ।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক্সে দেওয়া পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সক্ষমতার পেছনে আছে ‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’। তার ভাষায়, ইরানই ঠিক করবে ‘কখন এবং কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ হবে’।

খবরে বলা হচ্ছে, নিম্নস্তরের ইরানি কমান্ডাররা এখন স্বাধীনভাবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক ইউনিট শেষ পাওয়া নির্দেশ মেনে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

এই বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত ইরানের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর সংকটও তীব্র হয়েছে। ইরানের সতর্কতা ও বাধার কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বৈশ্বিক উদ্বেগ বেড়েছে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জার্নালের গবেষণা মূলত রাষ্ট্রীয় সামরিক কাঠামোর ওপর জোর দিলেও অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘মোজাইক ডিফেন্স’ শুধু আইআরজিসির মধ্যে সীমিত নয়। এটি বাসিজের মতো মিলিশিয়া কাঠামোর মধ্যেও বিস্তৃত।

এই মিলিশিয়াগুলোর রাজনৈতিক, আদর্শিক এবং আঞ্চলিক শিকড় রয়েছে। ফলে সামরিক প্রতিরক্ষা এবং সমাজভিত্তিক প্রতিরক্ষার সীমারেখা অনেক সময় ঝাপসা হয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, এই কাঠামো ইরানের সাংবিধানিক ও বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে সমাজের ভেতরেই প্রতিরক্ষার সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা প্রচলিত সামরিক সংগঠনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

তবে এই বিকেন্দ্রীকরণ বড় সুবিধা দিলেও ঝুঁকিও আছে। মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা যদি কেন্দ্রীয় অনুমতি ছাড়াই হামলা চালাতে পারেন, তাহলে সংঘাত দ্রুত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও তখন জটিল হয়ে যায়।

কারণ ‘মোজাইক ডিফেন্স’ ইরানের সামরিক আচরণকে অনেক বেশি অপ্রত্যাশিত করে তোলে। এতে প্রতিপক্ষের হিসাব যেমন কঠিন হয়ে যায়, তেমনি সংঘাত থামানোর উদ্যোগও জটিল হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’ এই ঐতিহাসিক যুদ্ধের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আঘাত এলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্যই এই কৌশল তৈরি করা হয়েছিল।

ভূগোল, অসম যুদ্ধকৌশল এবং স্বায়ত্তশাসিত সামরিক কাঠামোর সমন্বয়ে এই নীতি ইরানকে পরাজিত করা আরও কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনা বা উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকেও করেছে আরও জটিল।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন