খাবার নেই, জ্বালানি নেই, পর্যটক নেই: যুক্তরাষ্ট্রের চাপে কিউবার জীবন থমকে যাচ্ছে
ম্যানডি প্রুনা আজও হেসে ফেলেন, যখন ২০১৫ সালের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করেছিলেন। দীর্ঘ বৈরিতার পর দুই দেশের মধ্যে নতুন এক দরজা খুলেছিল।
সে সময় আমেরিকান পর্যটকের ঢল নেমেছিল কিউবায়। প্রুনা আর তার উজ্জ্বল লাল রঙের ১৯৫৭ সালের শেভ্রোলেট যেন সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দিনরাত কাজের চাপ থাকত। অসংখ্য পর্যটক তার গাড়িতে চড়ে হাভানার রাস্তায় ঘুরেছেন। তাদের মধ্যে উইল স্মিথ, রিহানা ও কিম কার্দাশিয়ানের মতো তারকারাও ছিলেন। কিউবার মানদণ্ডে তারা বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করতেন।
প্রুনার শেভ্রোলেট ছিল সেই তিনটি পুরোনো আমেরিকান গাড়ির একটি, যেগুলোকে হাভানায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের পটভূমিতে রাখা হয়েছিল। সেটিই ছিল দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
প্রুনা বলেন, ওই সময় সমাজের সব স্তরের মানুষ উপকৃত হয়েছিল। অনেকে বাড়ি রঙ করেছেন। নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন। তার নিজের জন্যও সময়টা ছিল অসাধারণ। তিনি বলেন, ‘ওটাই ছিল কিউবার পর্যটনের সেরা সময়।’
কিন্তু এখন চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বহু দশকের মধ্যে, হয়তো পুরো প্রজন্মের জীবনে, কিউবা সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপ এবং মেক্সিকোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকির মাধ্যমে কিউবার জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে তেলের প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষ্য একটাই, কিউবাকে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বাধ্য করা।
কিউবার হাতে এখন পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে বিপুল পরিমাণ তেল দরকার, তা সরবরাহ করার মতো মিত্রও নেই। যে সামান্য তেল আছে, সেটিও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে পর্যটক কমে যাওয়ায় প্রুনার মতো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘কাজ করতে আমার গ্যাস দরকার, আর পর্যটক দরকার।’
সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রায় এক কোটি মানুষের এই দ্বীপদেশে জীবন থমকে যাচ্ছে। অনেক স্কুলে ক্লাস বন্ধ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কর্মীদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। খালি হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে। রাশিয়া ও কানাডা থেকে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, কারণ দীর্ঘ দূরত্বের জন্য পর্যাপ্ত জেট ফুয়েল নেই। যুক্তরাজ্য ও কানাডা তাদের নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলেছে।
বার্ষিক হাবানোস সিগার উৎসব বাতিল হয়েছে। শেরিট ইন্টারন্যাশনাল জ্বালানি সংকটের কারণে নিকেল ও কোবাল্ট খনন কার্যক্রম স্থগিত করেছে। অনেক সরকারি হাসপাতাল সেবা কমিয়েছে। জ্বালানি ও ট্রাকের অভাবে বিভিন্ন এলাকায় ময়লা জমে আছে।
হাভানায় রাতে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। আকাশে তারা স্পষ্ট দেখা যায়। মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ কখন যাবে, কতক্ষণ থাকবে—সেই আলোচনা করে।
ট্রাম্প বলেন, ‘তেল নেই, টাকা নেই, কিছুই নেই।’ তিনি জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রুবিও আগেই বলেছেন, কিউবার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কবে ক্ষমতা ছাড়বে, সেটাই তার আলোচনার বিষয়।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মারিয়া এলভিরা সালাজার বলেছেন, ‘এখন সব বন্ধ করার সময়। আর পর্যটন নয়, আর রেমিট্যান্স নয়।’ তিনি স্বীকার করেন, মায়ের ক্ষুধা বা শিশুর কষ্ট ভাবা খুবই কষ্টের। কিন্তু তার মতে, স্বল্পমেয়াদি কষ্ট আর দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এদিকে প্রতিদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য আমদানি করা কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পণ্য সংরক্ষণ করতে না পেরে কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল জনগণকে ‘সৃজনশীলভাবে প্রতিরোধ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেখানে যা উৎপাদন সম্ভব, তাই খেতে হবে। জ্বালানি কম থাকলে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় খাদ্য পৌঁছানোও কঠিন হবে।
হাভানার কৃষিপণ্যের বাজারে বিক্রেতা আনায়াসি বলেন, নতুন করে পণ্য আনতে আগের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি খরচ হচ্ছে। তার আশঙ্কা, পরিস্থিতির প্রভাব ভয়াবহ হবে।
২০ বছর ধরে পর্যটক পরিবহন করে ভালো আয় করা প্রুনা এখন স্পেনে পরিবারসহ পাড়ি জমানোর কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, সবকিছু অনিশ্চিত। ডলারে গ্যাস কিনতে হলে, পর্যটক না থাকলে সেই টাকা উঠবে কীভাবে?
সেদিন সকালেই তিনি ক্লাসিক গাড়িচালক হিসেবে নিজের লাইসেন্স স্থগিত করেছেন। তার চোখে এখন ভবিষ্যৎ ধোঁয়াটে।

