জাপানের রাজনীতিতে তাকাইচি ঝড়: এক নতুন ধারা, নতুন উত্তেজনা
আজ ভোটে তার পরীক্ষা
টোকিওর শহরতলির ছোট্ট এক ট্রেন স্টেশনের সামনে প্রচণ্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে জড়ো হয়েছেন হাজারো মানুষ। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন এক ঝলক দেখার জন্য। যেন জে-পপ তারকা এসেছেন, অথচ তিনি একজন রাজনীতিক—জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
হঠাৎ ফুটপাথে দেখা মিলতেই ভিড়ের ভেতর থেকে হালকা এক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাকাইচি বলেন, এই ভালোবাসাই রূপ নিক ভোটে—যেখানে তার দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
তাকাইচি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় আগাম নির্বাচন ডেকেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন—যদি এলডিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তিনি পদ ছাড়বেন। জাপানের রাজনীতিতে এতটা সরাসরি অবস্থান খুব কমই দেখা যায়।
কিন্তু তাকাইচি সাধারণ কোনো রাজনীতিক নন।
তিনি হেভি মেটাল বাজান, মোটরবাইকে চড়েন, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দারুণ সরব। অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পুরনো, পুরুষপ্রধান রাজনীতির ইমেজ ঝেড়ে ফেলে এনেছেন এক নতুন আবহ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছোট ছোট ভিডিও, স্পষ্ট স্লোগান, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ—সবকিছুই ছড়িয়ে পড়ছে তরুণদের মাঝে। গত মাসে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং-এর সঙ্গে কেপপ গানের তালে নাচেও অংশ নেন।
তার দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট বিষয়—যেমন কোন ব্যাগ বহন করেন, কী ধরনের কলম ব্যবহার করেন—সবই এখন খবর। নারা শহরের দোকানে এখন বিক্রি হয় তার স্লোগান ছাপা তোয়ালে, চাবির রিং, এমনকি কুকিও, যেখানে দেখা যায় তাকাইচি ও তার রাজনৈতিক আদর্শের মানুষ মার্গারেট থ্যাচারকে।
তরুণদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা অভূতপূর্ব।
দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, তাকাইচির হাসিই প্রথমে তাদের আকৃষ্ট করে। তারা তাকে ডাকে ‘সানা-চান’ বলে—যা সাধারণত ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাদের একজন গর্ব করে জানায়, সে তাকাইচির মতোই একই কলম ব্যবহার করে।
“এতে মনে হয়, সে আমাদের কাছের মানুষ,” বলে সে।
আরেক তরুণ, ইউহো ওইশি বলেন, “আগের প্রধানমন্ত্রীদের মতো নয়, তাকাইচির কাজ আমরা নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাই। এটা তরুণদের মধ্যে রাজনীতির আগ্রহ বাড়াচ্ছে।”
তার সচিব নোবোরু কিনোশিতা বলেন, “আমরা বুঝি, তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। তাই সেখানেই আমরা বেশি মনোযোগ দিচ্ছি।”
এই কৌশল কাজে দিচ্ছে।
জনমত জরিপ বলছে, ২০-৩০ বছর বয়সী ভোটারদের মাঝে তাকাইচির জনপ্রিয়তা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশেরও বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে জাপানি রাজনীতিতে এ ধরনের জনপ্রিয়তা দেখা যায়নি।
তবে এই জনপ্রিয়তা তার দলের নয়। এলডিপি বিগত বছরগুলোতে নির্বাচনে ব্যর্থতা, মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্নীতির কারণে ভেঙে পড়েছে। সেই দলের হাল ধরেই তাকাইচি ঘুরে দাঁড়াতে চাচ্ছেন।
তার যোগাযোগের ভঙ্গিমা একান্ত নিজের। সংসদের বাজেট অধিবেশনের উত্তর তিনি নিজেই লেখেন। তার সচিব বলেন, “তাকাইচি এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যা সাধারণ মানুষও সহজে বুঝতে পারে।”
বিশ্ব রাজনীতিতে তরুণদের আকৃষ্ট করে জনপ্রিয় নেতারা অনেক কিছু বদলে দিয়েছেন। জাপানে তরুণদের ভোটার উপস্থিতি কম হলেও তাকাইচির উপস্থিতি তাতে নতুন প্রাণ এনেছে।
এমনকি বয়স্কদের মাঝেও তার জনপ্রিয়তা কম নয়।
সাতোশি উচিয়ামা নামে এক সমর্থক, যিনি নির্বাচনী প্রচারণায় লিফলেট বিতরণ করেন, বলেন—জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতে তাকাইচির শক্ত অবস্থান তাকে মুগ্ধ করেছে।
“চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়ার মতো বিষয় এখন আর অবহেলার নয়,” বলেন উচিয়ামা। “জাপানের প্রতিরক্ষায় কঠোর অবস্থান দরকার।”
তাকাইচির রক্ষণশীল ভাবমূর্তি সুপরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী ‘নিপ্পন কাইগি’ লবির সক্রিয় সদস্য। দেশপ্রেমভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও সংবিধান সংশোধনের পক্ষে তিনি বরাবরই কথা বলে আসছেন।
তবে তার নীতিগত অবস্থান অনেক সময় স্পষ্ট নয়।
যেমন, তিনি একবার খাবারের ওপর ৮ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের সমালোচনার মুখে সেটি পরে প্রচারণা থেকে সরিয়ে নেন।
সরকারি খরচ বাড়ানোর পক্ষপাত, দুর্বল ইয়েন নিয়ে তার নমনীয় মন্তব্য—এসব বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে চীন নিয়ে তার মন্তব্য—যাতে তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান দখলে চীনা হামলা হলে জাপান সামরিক জবাব দিতে পারে’—তা দুই দেশের সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাজিমে কিদেরা বলেন, “তার মন্তব্যের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি। তবে সময় গেলে মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারে, তাকাইচির হাতে জাপানের অর্থনীতি কতটা নিরাপদ।”
তবু এখনই তার জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগেনি।
আজকের (রোববার) নির্বাচনে তাকাইচির বাজি হলো—এই জনপ্রিয়তাই হয়তো তাকে আরেকটা মেয়াদ এনে দেবে, সময় দেবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।
ততদিনে মানুষ বিচার করতে পারবে—তিনি শুধু উজ্জ্বল মুখ নন, নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাও রাখেন কি না।

