Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

সিএনএন প্রতিবেদন

এই খনিজ সম্পদ চায় যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন অস্ত্রধারী জঙ্গিরা

Icon

সোফিয়া সাইফি

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২১ পিএম

এই খনিজ সম্পদ চায় যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন অস্ত্রধারী জঙ্গিরা

পাকিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালার বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে মোহাম্মদ খেল তামার খনি। চারপাশজুড়ে খাঁজ কাটা পাহাড় আর কঠিন ভূখণ্ড। আফগান সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ মাইল দূরে এই খনির গায়ে রোদ পড়লে চকচকে কাদা আর ধুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ।

গত বছর এখান থেকে প্রায় ২২,০০০ টন তামা উত্তোলন করা হয়। এসব খনিজ পাড়ি দেয় চীনের দিকে—এক দেশ, যার খনিজ ও ধাতুর প্রতি চাহিদা প্রায় অশেষ।

এই খনির পাশেই আরেকটি তামার খনি আছে, যেটি পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী আরও দশগুণ বেশি সম্পদ ধরে রেখেছে। বলা হচ্ছে, এটি কেবল আমেরিকার বার্ষিক তামার চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ পূরণ করতে পারে। এ খবর শুনে ওয়াশিংটনের চোখ বড় হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ঘোষণা করেছে।

পাকিস্তানের ধারণা, তাদের মাটির নিচে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ লুকিয়ে আছে—তামা, লিথিয়াম, কোবাল্ট, সোনা, অ্যান্টিমনি, আরও অনেক কিছু। আর এই স্বপ্নই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের সূচনা করেছে।

কিন্তু এই খনিজ সম্পদের বেশিরভাগই রয়েছে সেই সীমান্ত অঞ্চলে, যেগুলো বহু বছর ধরে জঙ্গি হামলায় জর্জরিত। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে হঠাৎ করে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, আর রেখে যায় আধুনিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার।

সিএনএনের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের কয়েকটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মার্কিন তৈরি শত শত রাইফেল, মেশিনগান, স্নাইপার দেখা গেছে—যেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে নতুন ধাঁচের জঙ্গিদের কাছ থেকে।

মোহাম্মদ খেল খনির কাছেই ওয়ানায়, একটি সামরিক ক্যাডেট কলেজে আত্মঘাতী হামলার পর উদ্ধার করা হয়েছে রক্তমাখা ব্যান্ডানা আর তিনটি এম-১৬ রাইফেল। ব্যান্ডানায় লেখা: ‘আমি শহিদ হতে প্রস্তুত’। রাইফেলগুলোর গায়ে লেখা ছিল: ‘প্রপার্টি অব ইউএস গভর্নমেন্ট, সাউথ ক্যারোলিনা’।

এই অস্ত্রগুলো এখন সীমান্ত অঞ্চলে নতুন করে জঙ্গিদের শক্তিশালী করে তুলেছে। যা খনিজ সম্পদ উত্তোলনে মার্কিন ও পাকিস্তানি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশ্বে পরিশোধিত ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজের ৯০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। এই খনিজই শক্তিশালী করে বৈদ্যুতিক যান থেকে শুরু করে আইফোন পর্যন্ত সব প্রযুক্তিকে। ট্রাম্প তাই এই নির্ভরতা ভাঙতে চেয়েছেন।

ক্ষমতায় এসেই তিনি অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করেন। ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটি খনিজ ভর্তি সিন্দুক উপহার দেন ট্রাম্পকে।

ট্রাম্প মুগ্ধ হন। এরপর প্রকাশ্যে প্রশংসা করেন মুনিরকে—‘মাই ফেভারিট ফিল্ড মার্শাল’।

বিশ্বজুড়ে এখন চলছে এক ধরনের ‘কপার রাশ’। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক চাহিদা ৩০ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৫০ মিলিয়নে।

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে রেকো ডিক খনিতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিচালিত তামার ভাণ্ডার। ডিসেম্বর মাসে মার্কিন রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক ঘোষণা করে, তারা ১.২৫ বিলিয়ন ডলার দেবে এই খনি উন্নয়নে।

এই খনিজ সম্ভাবনার মাঝেও রক্তপাত থেমে নেই। পেশোয়ারের একটি হাসপাতালে দেখা মেলে আল্লাহ উদ্দিনের, যে সম্প্রতি মোহাম্মদ খেল খনির কাছাকাছি এক জঙ্গি হামলায় দুই পা হারিয়েছে।

তিন সন্তানের বাবা আল্লাহ উদ্দিন বলছিলেন, ‘আমি গুলি করেছিলাম, কিন্তু পৌঁছাতে পারিনি। ওদের অস্ত্র ছিল অনেক উন্নত।’

পাকিস্তানি সেনা চিকিৎসক কর্নেল বিলাল সাঈদ জানান, এখন আর আগের মতো বোমার আঘাত নয়, রোগীরা আসছেন স্নাইপারের গুলিতে আহত হয়ে। এখনকার হামলাগুলো হয় রাতে, কারণ জঙ্গিদের কাছে আছে ‘নাইট ভিশন ডিভাইস’।

২০২৫ সালে দেশজুড়ে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১২০০-র বেশি মানুষ। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল অর্ধেক।

পাক সেনাবাহিনীর তথ্যমতে, ২০২২ সাল থেকে জঙ্গিদের কাছ থেকে মার্কিন অস্ত্র জব্দ করা হচ্ছে। এখন প্রায় প্রতিটি সংঘর্ষেই এমন অস্ত্র পাওয়া যায়।

পেন্টাগনের দেওয়া তথ্য বলছে, এই অস্ত্রগুলো একসময় আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছিল।

এই অস্ত্রের কিছু অংশ পৌঁছেছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) হাতেও। সম্প্রতি এই গোষ্ঠীর হামলায় নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। জবাবে পাকিস্তান দাবি করে, তারা ১৩৩ জন জঙ্গিকে হত্যা করেছে।

বিএলএ দীর্ঘদিন ধরে বেলুচিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।

পাক সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, খনিজ এলাকা নিরাপদ করতেই হবে, আমাদের কাছে আর কোনো পথ নেই।

এই যুদ্ধ আরও বড় হতে পারে। কারণ এখন জঙ্গিদের হাতে আধুনিক অস্ত্র।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আল্লাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমি রাগে পুড়ছি। আমার নিজের পা নেই। পাশে আমার মতো আরও অনেক আহত বন্ধু পড়ে আছে। এভাবে কি দেশ চলে?’ 

সোফিয়া সাইফি সিএনএনের ইসলামাবাদ প্রতিনিধি ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করছেন। পাকিস্তানে সংবাদ সংগ্রহ ও রিপোর্টিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন, সম্মান রক্ষার নামে হত্যা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা এবং করাচির প্রাণঘাতী তাপদাহ—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিবেদন করেছেন।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন