আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
গাজাও কি বসনিয়ার পথে? গড়ে উঠছে আধা-ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা
নিজারা আহমেতাশেভিচ
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী হোসে মারিয়া আজনার ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে মাদ্রিদে বসনিয়া বিষয়ক ‘পিস ইমপ্লিমেন্টেশন কাউন্সিল’ সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য দিচ্ছেন [সার্জিও পেরেজ/রয়টার্স]
গত কয়েকদিনে গাজা শান্তি পরিকল্পনার খুঁটিনাটি প্রকাশ পেলে, অনেকের চোখেই তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় ৩০ বছর আগে যুদ্ধশেষে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় হওয়া শান্তিচুক্তির সঙ্গে।
গাজার এই পরিকল্পনায় সংঘাত বন্ধের আশ্বাস রয়েছে। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাইরের শক্তির স্থায়ী কর্তৃত্ব। পরিকল্পনাকারীরা বলছে, ফিলিস্তিনিদের জন্য তারা ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে’ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলবে। বসনিয়ার মানুষও তিন দশক ধরে এই একই কথা শুনে আসছে। কিন্তু আজও তারা জানে না, এই ‘মানদণ্ড’ বলতে আসলে কী বোঝানো হয়।
বসনিয়ায় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পর দেশটি রূপ নেয় এক ধরনের ‘সেমি-প্রটেক্টোরেটে’—অর্থাৎ এমন এক ভূখণ্ডে, যেটি বাইরের শক্তির নামে পরিচালিত হয়, যার কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। এখানে যারা সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের জবাবদিহি করতে হয় না।
ডেটন চুক্তি, যা বসনিয়া যুদ্ধের ইতি টেনেছিল, তা হয় যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে মধ্যস্থতা করে বিদেশি কূটনীতিকেরা। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন যুদ্ধরত পক্ষগুলোর নেতারা—যাদের মধ্যে অনেকেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, যারা সেই যুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিল। সাধারণ বসনিয়াবাসীরা এই আলোচনার বাইরে ছিলেন। আজ গাজাতেও একই ঘটনা ঘটছে—একটি জাতির পক্ষে শান্তির কথা বলা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে নয়।
বসনিয়ার সেই চুক্তি বৈধতা দেয় যুদ্ধকালের সীমান্ত বিভাজনকে। তৈরি হয় এক বিভক্ত রাজনৈতিক কাঠামো—যার মধ্যে আছে দুটি আলাদা অঞ্চল (রিপাবলিকা সারপস্কা ও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফেডারেশন), একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এবং এক পৃথক জেলা (ব্রচকো)।
নামেমাত্র ক্ষমতা থাকে একটি মন্ত্রিপরিষদ এবং তিনটি বড় জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত একটি ঘূর্ণায়মান প্রেসিডেন্সির হাতে। বসনিয়ার সংবিধান, যা একটি দেশের সর্বোচ্চ শাসননীতি হওয়া উচিত, সেটিও জনগণ লেখেনি। এটি ইংরেজিতে তৈরি করে শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতাকারীরাই সংযুক্ত করে দেয়। আজও এর কোনো সরকারিভাবে অনূদিত স্থানীয় ভাষার সংস্করণ নেই।
বাস্তবে, মন্ত্রিপরিষদ ও প্রেসিডেন্সির হাতে নেই কোনো প্রকৃত ক্ষমতা। দেশের সিদ্ধান্ত নেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ‘অফিস অব দ্য হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ (ওএইচআর) এবং ‘পিস ইমপ্লিমেন্টেশন কাউন্সিল’ (পিআইসি) নামের দুটি সংস্থার মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ চলে।
ওএইচআরের নেতৃত্বে থাকেন একজন ইউরোপীয় রাজনীতিবিদ। তার হাতে থাকে আইন তৈরি বা বাতিলের, এমনকি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা—এমনকি কোনো আইনি প্রতিকার ছাড়াই। বসনিয়াবাসীরা আজও জানে না, কী যোগ্যতা থাকলে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে কেউ বসতে পারে।
পিআইসি গঠিত ৫৫টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে, যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং ওএসসিই। তারাই ওএইচআরের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে। অথচ এই নিয়োগ-প্রক্রিয়া কেমন, তা আজও জানে না বসনিয়াবাসীরা। তাদের সিদ্ধান্ত আসে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে, আর সেই সিদ্ধান্ত কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। সাংবাদিকেরাও তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারেন না।
গাজার জন্য যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, সেটিও একই রকম। ‘বোর্ড অব পিস’-এর নেতৃত্বে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখানে কোনো দেশ চাইলে ১ বিলিয়ন ডলার দিয়ে সদস্যপদ কিনতে পারে। এছাড়া দুটি নির্বাহী বোর্ড থাকবে—একটি গঠিত মার্কিন কর্মকর্তাদের ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে, আরেকটি পশ্চিমা ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের নিয়ে। তারা স্থানীয় প্রশাসন তদারক করবে, নিজেদের নিরপেক্ষ ও দক্ষ দাবি করলেও দেশের চেয়ে উপরে অবস্থান করবে।
সবশেষে থাকবে একটি ‘প্রযুক্তিবাদী প্রশাসন’—যেখানে কাজ করবেন নির্বাচিত ‘যোগ্য ফিলিস্তিনি’ ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
বসনিয়ায় বিদেশি নিয়ন্ত্রণ শুধু বাইরের আধিপত্য দিয়ে নয়, বরং ভেতরের রাজনীতিবিদদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে। যেসব স্থানীয় নেতা ক্ষমতার বদলে চুপ থাকতে রাজি, তারাই হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মহলের ভরসা। এতে করে আসলে কোনো পরিবর্তন হয় না, বরং থেমে থাকে। গড়ে ওঠে এক ধরনের দাতা-নির্ভর নাগরিক সমাজ—যারা সক্রিয় ও দৃশ্যমান হলেও বাইরের হাতে সহজে নিয়ন্ত্রিত।
তাই বসনিয়ায় যারা এই ব্যবস্থার সমালোচনা করেছে, তাদের কথা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে ‘শান্তির হুমকি’ বলে। ১৯৯৭ সালে ওএইচআরের অনুরোধে ন্যাটো পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করে একটি সম্প্রচারমাধ্যম বন্ধ করে দেয়, কারণ তারা ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাংবাদিকতা’ অনুসরণ করছিল না।
এই একই যুক্তি এখনো টিকে আছে। ডেটন চুক্তির ৩০ বছর পূর্তিতে ভিডিও বার্তায় বর্তমান হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিস্টিয়ান শ্মিট বলেন, ‘যারা আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়ী করে, তারা ভুলে যায়—শেষ মুহূর্তে হলেও, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ না হলে বসনিয়া বিশৃঙ্খলায় ডুবে যেত।’
তার বক্তব্য ছিল—ডেটন হলো ভবিষ্যতের ভিত্তি, ভবিষ্যত নিজে নয়। এরপর তিনি ‘অভিযোগ নয়, পদক্ষেপ’-এর ডাক দিলেও বলেননি, কে সেই পদক্ষেপ নেবে, কীভাবে নেবে।
তবু বসনিয়া পুরোপুরি নীরব থাকেনি। ২০১৪ সালে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়—শুরুতে তুজলায়, পরে ছড়িয়ে পড়ে বিশটির বেশি শহরে। কর্মজীবীরা এগিয়ে আসেন। তারা রাস্তায় নামেন, খোলা সমাবেশ করেন, রাজনৈতিক দাবি তোলেন। ওই মুহূর্তে মানুষ বুঝেছিল—গণতন্ত্র সম্ভব।
কিন্তু প্রতিক্রিয়া আসে নিস্তব্ধতা, উপেক্ষা আর দমন-পীড়নের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু দেখেছে, কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আন্দোলন থেমে গেলে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি।
তবে আন্দোলনের কিছু চিহ্ন থেকে যায় দেয়ালে আঁকা লেখায়। সবচেয়ে বিখ্যাত লেখাটি এখনো দেখা যায় সারায়েভোর ক্যান্টন দপ্তরের দেয়ালে: ‘যারা ক্ষুধা বপন করে, তারা রাগ ঘরে তোলে।’
এরপর শুরু হয় বড় রকমের দেশত্যাগ। ২০১৪ সাল থেকে প্রায় ৫ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে। আরও অনেকে সুযোগের অপেক্ষায়।
এদিকে জাতীয়তাবাদ—যা এক সময় ছিল যুদ্ধের মতাদর্শ—এখন পরিণত হয়েছে শাসনের কৌশলে। স্থানীয় রাজনীতিকেরা এটি ব্যবহার করছে, আন্তর্জাতিক মহল তা মেনে নিচ্ছে।
সারায়েভোর দুই নারীবাদী লেখক গোরানা ম্লিনারেভিচ ও নেলা পরোবিচ তাদের ‘পিস দ্যাট ইজ নট’ গ্রন্থে লিখেছেন—শান্তি কখনো কেবল চুক্তিতে শুরু বা শেষ হয় না। বসনিয়ায় জোরপূর্বক চাপানো শান্তি রাজনীতি, অর্থনীতি আর সমাজকে বহুকাল ধরে পেছনে টেনে রেখেছে। গাজার জন্যও সেই আশঙ্কা এখন ঘনিয়ে আসছে।
যদি প্রশ্ন করা হয়—বসনিয়ার শান্তিচুক্তি কি সফল ছিল? বেশিরভাগ মানুষ বলবে, হ্যাঁ, সেটা যুদ্ধ থামিয়েছিল। কিন্তু শুধু সহিংসতা থামানোই শান্তি নয়।
শান্তি যদি হয় শুধু চাপিয়ে দেওয়া, তবে তা হয়তো স্থিতি আনে, কিন্তু ন্যায়বিচার নয়। হয়তো শাসনব্যবস্থা তৈরি করে, কিন্তু গণতন্ত্র নয়।
বসনিয়ার অভিজ্ঞতা তাই এক ধরনের সতর্ক সংকেত। শান্তি আর গণতন্ত্র—এই দুটি একসঙ্গে সম্ভব, যদি মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়। তাদের ইচ্ছা উপেক্ষা করে যেটা হয়, সেটাই এখন গাজার সামনে রাখা হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড’ নামে।
গাজাকে সেই পথে ঠেলে দেওয়া যাবে না। ইতিহাস বলছে, এই ভুলের খেসারত দিতে হয় দীর্ঘদিন। মানুষকে পাশে নিয়ে এগোনোই একমাত্র পথ।
