Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

যদি কিউবা ভেঙে পড়ে, দায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়—গ্লোবাল সাউথেরও

Icon

বেলেন ফার্নান্দেজ

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

যদি কিউবা ভেঙে পড়ে, দায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়—গ্লোবাল সাউথেরও

গ্যাস স্টেশনে জ্বালানি নিতে লম্বা লাইনে অপেক্ষায় চালকেরা, হাভানা, কিউবা, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬। [এপি ছবি/রামোন এসপিনোসা]

মঙ্গলবার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইওয়া অঙ্গরাজ্যে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হাস্যরস করলেও, তার কথায় ছিল এক গম্ভীর বার্তা। তিনি বললেন, ‘কিউবা খুব শিগগিরই ভেঙে পড়বে। কিউবা এমন এক দেশ, যেটা একেবারে ধ্বংসের কাছাকাছি।’

এটাই প্রথম নয়, এর আগেও ট্রাম্প একাধিকবার কিউবার পতন নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত স্বৈরাচারী শাসক বাতিস্তাকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই কিউবাকে ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

তবে এবার ট্রাম্পের হুমকিতে আগের চেয়ে একটু বেশি গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। কারণ এর কিছুদিন আগেই তার প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণ’ করেছে। এই বিতর্কিত ঘটনার কোনো জবাবদিহি এখনো যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি। অথচ ট্রাম্প কিউবার অর্থনৈতিক সংকটের প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাকে সামনে টানলেন— ‘ওরা টাকা আর তেল পেত ভেনেজুয়েলা থেকে। এখন আর পাচ্ছে না।’

এই অবস্থায়, কিউবার যেসব দেশ মিত্র হিসেবে পরিচয় দেয়, তাদের অনেকেই হয়তো কিউবার পাশে দাঁড়াবে বলে আশা করা যায়। অন্তত এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা মুখ তো খুলবে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিউবা পেয়েছে কেবল কাগুজে সমর্থন। যেমন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম। তার আগের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদরের মতো তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করার অভিনয় করতে করতে যেন সেই একই পথেই হাঁটছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র চায়।

সংবাদমাধ্যমে এসেছে, মার্কিন চাপে মেক্সিকো কিউবায় নির্ধারিত তেল সরবরাহ বন্ধ করেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম একাধিকবার বলেছেন, তেল সরবরাহ একটি ‘সার্বভৌম সিদ্ধান্ত’ এবং মেক্সিকো কিউবার সঙ্গে ‘ঐক্যবদ্ধ’।

এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কিউবা সংকটে রয়েছে। সেই মানবিক কারণে তাদের তেল সহায়তা করা হয়। তিনি বলেন, ‘অনেক বছর ধরেই এই অবরোধ চলছে, যার ফলে চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’

২০২২ সালে লেখক যখন কিউবা সফরে যান, তখন দেশজুড়ে চিনি, দুধ, এমনকি ওষুধেরও অভাব ছিল। যে দেশটি একসময় উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা আর আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তার জন্য পরিচিত ছিল, সেই কিউবায় তখন সাধারণ ব্যথার ওষুধও মিলছিল না।

একদিন হাভানার সমুদ্র পাড়ে দৌড়াতে গিয়ে লেখক পড়ে যান। রক্তাক্ত হাঁটু নিয়ে যখন কাছের একটি ফার্মেসিতে যান, কর্মীরা দুঃখ প্রকাশ করে জানান, কিছুই নেই। দেওয়া হলো ‘সাবান আর পানি’ ব্যবহারের পরামর্শ।

এই একই পরামর্শ দিয়েছিল ৪৩ বছর বয়সী এক কিউবান, যার নাম ইরাউদিস। সে ঘটনার সময় পাশের দেয়ালে, ১৯০১ সালে নির্মিত সেই রাস্তার ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাশাসক লিওনার্ড উডের নাম খোদাই করা ছিল।

ইরাউদিস লেখককে বলেছিল, সে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারবে না, কারণ তার নিজের পা নেই। তবে সে লেখকের আতঙ্ক কমিয়ে তাকে শান্ত করেছিল। সেই মুহূর্তের মানবিক সহায়তা ছিল ‘ঐক্য’র এমন এক বাস্তব উদাহরণ, যা কেবল তেল বন্ধ করে আবার ‘মানবিকতার’ কথা বলার চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ।

তবে কেবল মেক্সিকো নয়, কিউবার পাশে দাঁড়াতে বাকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও যেন দ্বিধায় আছে। অনেকেই মুখে কিছু বলছে না। ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে কিউবার পতন কামনা করছেন, তখন বেশিরভাগ দক্ষিণ দেশ যেন কানে তুলছে না কিছুই।

এই একই দিনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ইংরেজি এক্স অ্যাকাউন্টে কিউবার ওপর থেকে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা ‘তাৎক্ষণিক তুলে নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে। চীন বলেছে, তারা কিউবার পাশে থাকবে এবং সহায়তা অব্যাহত রাখবে। চীন আরও বলেছে, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের নেতৃত্বে দেশটির জনগণ এই সংকট কাটিয়ে উঠবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটা ছোট্ট দ্বীপ যখন বিশ্ব পরাশক্তির রোষানলে পড়ে, তখন কেবল ‘সংহতি’র বুলি দিয়ে সেই সংকট কেটে ওঠা যায় না।

সেই মঙ্গলবারেই, ভারতীয় শহর কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে কিউবার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে স্থানীয় কয়েকটি ‘ঐক্য সংগঠন’। সেখানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় সেইসব মানুষদের সম্মানে, যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন।

এখন, যখন কিউবার অস্তিত্ব আরও কঠিন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, তখন সময় এসেছে তাদের মিত্রদের সত্যিকার অর্থে পাশে দাঁড়ানোর।

কারণ, যদি কিউবা সত্যিই ভেঙে পড়ে, যদি ট্রাম্প কিউবায় দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রতিরোধের পরও ‘রেজিম চেঞ্জ’ করতে সফল হন, তাহলে বিশ্বে আর কোনো জায়গাই নিরাপদ থাকবে না।

এই মুহূর্তে দরকার সত্যিকারের সহমর্মিতা। কারণ কিউবা যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি দেশের ব্যর্থতা নয়, বরং সারা বিশ্বের ব্যর্থতা।

বেলেন ফার্নান্দেজ একজন বিশ্লেষক ও লেখক, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ, লাতিন আমেরিকার রাজনীতি এবং বিশ্ব অভিবাসন সংকট নিয়ে ধারালো ও মানবিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

তার লেখার মূল শক্তি, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সমাজবিচ্ছিন্নদের কণ্ঠ তুলে ধরার দায়বদ্ধতা। তিনি বহু দেশে ঘুরে দেখেছেন রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, অভিবাসন নীতির বাস্তব চেহারা, এবং গ্লোবাল সাউথের প্রতিরোধের ইতিহাস।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন