আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: দুই দশকের পর ‘সব চুক্তির মা’ বাস্তবায়নের পথে
ইয়াশরাজ শর্মা
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম
দুই দশক আলোচনার পর অবশেষে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। উভয় পক্ষই একে আখ্যা দিয়েছে ‘সব চুক্তির মা’ হিসেবে।
এই চুক্তি এমন এক সময় স্বাক্ষর হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষ করে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারত ও ইইউ মিলিয়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার তৈরি হলো এই চুক্তির মাধ্যমে। আর এতে অর্থনৈতিক পরিসর দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা বৈশ্বিক জিডিপির এক চতুর্থাংশ।
প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে যোগ দিতে আসেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক যৌথ সম্মেলনে এই চুক্তি ঘোষণা করা হয়।
মোদি বলেন, ‘এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত সম্পর্ককেও গভীর করবে।’
উরসুলা এক্স-এ লিখেছেন, ‘আজ ইতিহাস গড়ল ইউরোপ ও ভারত। দুই বিলিয়ন মানুষের জন্য একটি মুক্ত বাণিজ্য এলাকা গঠিত হলো, যা উভয় পক্ষেরই লাভজনক হবে।’
চুক্তিটি পণ্যের পাশাপাশি পরিষেবা ও বিনিয়োগকেও অন্তর্ভুক্ত করছে। ইইউ ভারতকে ১৪৪টি পরিষেবা খাতে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে, আর ভারত ১০২টি খাত খুলছে ইউরোপের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক, সমুদ্র ও টেলিকম খাত।
ভারতের জন্য এটি সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যাল, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত ও পেট্রোলিয়াম খাতে ভারতের জন্য বড় সুবিধা বয়ে আনবে।
তবে এখনো এই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া আইনি যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী বছর এটি পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তির আওতায় ভারত প্রথমবারের মতো নিজের বহুল-সুরক্ষিত অটোমোবাইল খাত খুলছে। ইউরোপীয় গাড়ির ওপর এখন ১১০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হলেও, ধীরে ধীরে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। তবে ১৫ হাজার ইউরোর নিচে মূল্যের গাড়িগুলোর ওপর আগের করই বজায় থাকবে।
প্রথম পাঁচ বছর ইউরোপীয় বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ছাড় থাকছে না, যাতে দেশীয় নির্মাতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এরপর বছরে নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী সীমিত সংখ্যক গাড়ি আমদানি করা যাবে।
চুক্তি অনুসারে, ইইউ যেসব পণ্য ভারতে রপ্তানি করে, তার ৯৬.৬ শতাংশেই শুল্ক কমানো হবে বা তুলে দেওয়া হবে। এতে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকের বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হবে।
অন্যদিকে, ইইউ ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক পুরোপুরি তুলে দেবে এবং আগামী সাত বছরে এই পরিমাণ ৯৩ শতাংশে পৌঁছাবে। এর ফলে চিংড়ি, মাছ, রসায়নজাত পণ্য, চামড়া, টেক্সটাইল, বস্ত্র ও রত্নখাত সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
যদিও ইইউ এখনো ভারতকে তাদের ‘কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম’ থেকে ছাড় দেয়নি, তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের মতো ভারতের জন্যও ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে ইইউ-ভারত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩৬ বিলিয়ন ডলার। দুই পক্ষই ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
এই মুহূর্তে ইইউ ভারতের সবচেয়ে বড় পণ্য বাণিজ্য অংশীদার, এবং ভারতের পক্ষেও এই চুক্তি নতুন বাজারে প্রবেশের দারুণ সুযোগ তৈরি করছে।
চুক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপ একটি বড় ভূমিকা রেখেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর বসিয়েছে, বিশেষ করে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে।
ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ সত্ত্বেও ইউরোপ ও ভারত নিজেদের পথ তৈরি করছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এখন ধৈর্যের মাধ্যমে বিকল্প বাজার গঠনে মনোযোগী।
‘এই চুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়, এটি একটি কৌশলগত বার্তাও। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পথে এক বড় পদক্ষেপ’, বলেছেন দিল্লিভিত্তিক গবেষক হর্ষ পন্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি ইউরোপ ও ভারতের সম্পর্ককে কেবল অর্থনীতিতে নয়, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়ও আরও ঘনিষ্ঠ করবে।
