আল জাজিরার বিশ্লেষণ
দাভোসে ঘোষিত ট্রাম্পের গাজা উন্নয়ন পরিকল্পনা কী বলছে
সমুদ্র উপকূলে ঝকঝকে টাওয়ারের সারি, তৈরি হচ্ছে ‘নতুন গাজা’ আর ‘নতুন রাফাহ’। ১ লক্ষেরও বেশি আবাসন ইউনিট, সাজানো-গোছানো শিল্পাঞ্চল, এমনকি একটি নতুন বিমানবন্দর—সবই যুক্ত হয়েছে এই পরিকল্পনায়।
কিন্তু যাদের জন্য এই উন্নয়ন—গাজার সাধারণ মানুষ—তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শই করা হয়নি।
এটি মূলত একটি যুদ্ধ-পরবর্তী ‘মাস্টারপ্ল্যান’—এই সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এটি উন্মোচন করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও ব্যবসায়ী জারেড কুশনার।
কুশনার স্পষ্ট বলেন, ‘প্ল্যান বি বলে কিছু নেই।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক অভিযানে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতির (১০ অক্টোবর) পরও ইসরায়েলের হামলায় ৪৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজা পুনর্গঠনের নাম করে ট্রাম্প প্রশাসনের এই প্রস্তাবে ভূমি মালিকানা, সম্পত্তির অধিকার বা যুদ্ধাপরাধের বিচার সংক্রান্ত কোনো কথাই নেই। তারা শুধু জানাচ্ছে—কীভাবে ৬৮ মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষের ওপর চকচকে ভবন উঠবে, যেখানে এখনো হাজারো মৃতদেহ চাপা পড়ে আছে।
দাভোসে বক্তৃতার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মন থেকে একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। সবই নির্ভর করে জায়গার ওপর।’ তিনি বলেন, ‘এই সাগরতীরে চমৎকার জায়গাটা দেখে বললাম, এখানে কত কিছু হতে পারে।’
এই পরিকল্পনাকে ‘নবউপনিবেশিক’ হিসেবে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে গাজায় চলমান গণহত্যাকে কেবল ‘বিনিয়োগের সুযোগ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনি-মার্কিন লেখক সুজান আবুলহাওয়া এক্স-এ লিখেছেন, ‘গাজার উপর আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা এটি। এতে গাজার নিজস্ব চরিত্র মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। মানুষকে সস্তা শ্রমে পরিণত করে পর্যটনের জন্য উপকূল দখল করে নেওয়ার ছক কষা হয়েছে।’
দুই বছরেরও বেশি সময়ের ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত।
গাজার ২৩ লাখ মানুষ বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাবার আর পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এবং ইসরায়েল সব ধরনের সাহায্য আটকে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—‘বোর্ড অব পিস’ দিয়ে ট্রাম্প যা শুরু করেছেন, তা কি আদৌ গাজাবাসীর জন্য বাস্তবসম্মত?
বোর্ড অব পিস কী?
বৃহস্পতিবার দাভোসে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন ‘বোর্ড অব পিস’-এর চার্টার। এটি তার ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ এবং গাজা পুনর্গঠনের তদারকির একটি কাঠামো।
তিন বছর মেয়াদি এই বোর্ডে স্থায়ী সদস্য হতে হলে ১ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে।
১১ পাতার এই চার্টারে কোথাও ‘গাজা’ শব্দটি নেই। বরং এটি একধরনের আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যা জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বোর্ডে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, কুশনার এবং স্বয়ং ট্রাম্প। ট্রাম্প এখানে চেয়ারম্যান এবং তার হাতে ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। বোর্ডে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু—যার বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
৫০টির বেশি দেশের নেতারা আমন্ত্রণ পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে চীন ও রাশিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশও। তবে ট্রাম্প কানাডার আমন্ত্রণ বাতিল করেছেন—দাভোসে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান সমালোচিত হওয়ায়।
ট্রাম্প বলেন, ‘গাজায় এই বোর্ড খুব সফল হবে, আর তারপর আমরা অন্য জায়গাতেও বিস্তৃত হতে পারব।’
তবে পুরো বক্তব্যে কোথাও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা নেই।
হামাস এই পরিকল্পনাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে: ‘গাজার মানুষ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেবে না।’

