বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ২০২৬: কী হচ্ছে, কারা আসছেন, কী আলোচনায়
সুইজারল্যান্ডের ডাভোস—একটি বরফঘেরা শহর। সেই শহরেই শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)।
সোমবার শুরু হওয়া এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের রাজনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা।
বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার মধ্যে আয়োজিত এই সম্মেলন বৈশ্বিক এজেন্ডা গঠনের চেষ্টা করে।
আল্পস পর্বতমালার কোলে ১,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত শান্তিপূর্ণ শহর ডাভোস। এখানে ১৯৭১ সাল থেকে প্রতিবছর জানুয়ারিতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
এবারের সম্মেলন চলবে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৯টায় (স্থানীয় সময়) বৈঠকের কার্যক্রম শুরু হয়।
ডাব্লিউইএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩,০০০ অংশগ্রহণকারী থাকছেন এবারের সম্মেলনে। এর মধ্যে রয়েছেন ৬০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, ৮৫০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি বুধবার বক্তব্য দেবেন। তার সঙ্গে থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
ট্রাম্প ‘গাজা শান্তি বোর্ড’ নামে একটি বৈঠক আয়োজনেরও পরিকল্পনা করছেন।
এছাড়া আসছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেং, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি এবং কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স ত্শিসেকেদি।
ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেতাদের মধ্যে থাকছেন এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা, গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস, মিসট্রাল এআই-এর আর্থার মেনশ, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান এনগোজি ওকনজো-ইওয়ালা।
থাকছেন না ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ডব্লিউইএফ জানিয়েছে, ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কারণে এবার তাদের প্রতিনিধি পাঠানো ‘উপযুক্ত’ নয়।
মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপোও আসছেন না। দেশের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির কারণে তিনি জানিয়েছেন, ‘এই মুহূর্তে জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।’
তবে বিতর্ক সত্ত্বেও আমন্ত্রণ পেয়েছে ইসরায়েল। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এই বছরের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—‘সংলাপের মনোভাব’। পাঁচটি বিষয় ঘিরে আলোচনা চলছে: সহযোগিতা, প্রবৃদ্ধি, মানুষের জন্য বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধি গঠন।
প্রায় ২০০টি সেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ভূরাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য।
বিশেষ করে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এবার রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। ব্যবসায়ী নেতারা দেখছেন প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ, আবার শ্রমিক সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা বলছেন—এটা কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নীতিনির্ধারকেরা খুঁজছেন এক ভারসাম্যের পথ—যেখানে উদ্ভাবনের স্বাধীনতা থাকবে, আবার থাকবে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণও।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির নানা দৃষ্টিভঙ্গি, যেমন: গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকি, ভেনেজুয়েলা বা ইরান নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান—এসব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতির পরিসর হয়ে উঠেছে আরও বেশি জটিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের হুমকিকে ‘চাঁদাবাজি’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
এ কারণে এবারের ডাভোস সম্মেলন শুধু অর্থনীতির আলাপ নয়, বরং এক বৈশ্বিক রাজনৈতিক মানচিত্রে কে কোথায় দাঁড়িয়ে, সেটিও বুঝে নেওয়ার সুযোগ।
সমালোচকেরা বলছেন, ডাভোসের সম্মেলনে অনেক বড় বড় কথা হয়, কিন্তু বাস্তবে পদক্ষেপ নেয়া হয় খুব কম। বৈশ্বিক আয়বৈষম্য, জলবায়ু সংকটের মতো গুরুতর ইস্যুতে কার্যকর অগ্রগতি হয় না।
তবু প্রতিবারের মতো এবারও এই সভাকে কেন্দ্র করে দুনিয়ার দৃষ্টি নিবদ্ধ ডাভোসে।

