আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হাইব্রিড যুদ্ধের আসক্তি, অর্ধশত বছর দুনিয়া জুড়ে অশান্তি
জেফরি স্যাকস ও সিবিল ফারেস
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
পারমাণবিক যুগে যুদ্ধ মানেই ভয়াবহ বিপর্যয়। এই বাস্তবতা বুঝেই যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় না। তার বদলে চালায় ছায়া-যুদ্ধ—যার নাম হাইব্রিড যুদ্ধ।
গত কয়েক সপ্তাহে আমরা ভেনেজুয়েলা ও ইরানে এমন দুটো যুদ্ধের নমুনা দেখেছি। অর্থনৈতিক অবরোধ, সাইবার হামলা, নির্বাচিত সামরিক হামলা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো—সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর নীরব আগ্রাসন।
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ নতুন নয়। ২০০২ সালেই দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অভ্যুত্থানে সহায়তা করেছিল। ব্যর্থ হওয়ার পর তারা অন্য পথে এগোয়—অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রিজার্ভ জব্দ, তেলের উৎপাদনে ধ্বংসাত্মক হস্তক্ষেপ।
কিন্তু সরকার পড়েনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন মাত্রায় নেমে আসেন। বোমা ফেলে রাজধানী কারাকাসে হামলা, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ, তেলের চালান ছিনতাই এবং নৌ অবরোধ—যা এক ধরনের সরাসরি যুদ্ধই।
ধারণা করা হয়, এই আগ্রাসন কেবল ভূরাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও আদর্শিক। ইসরায়েলপন্থি ধনকুবেরদের তেলসম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ভেনেজুয়েলা বরাবরই ফিলিস্তিনের পাশে থেকেছে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে ইরানের সঙ্গে—যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দ।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধেও চলছে দীর্ঘস্থায়ী ছায়া-যুদ্ধ। যার শুরু ১৯৫৩ সাল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একসঙ্গে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে সরাতে ‘অপারেশন আজাক্স’ পরিচালনা করে। কারণ, মোসাদ্দেক ব্রিটিশ তেলের ওপর ইরানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
এরপর ক্ষমতায় ফেরানো হয় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে। তাকে টিকিয়ে রাখতে গড়া হয় গোপন পুলিশ বাহিনী সাভাক, যারা নজরদারি, আটক, নির্যাতন ও সেন্সরশিপ চালিয়ে বিরোধী কণ্ঠ দমন করত।
এই দমন-পীড়নই ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব ডেকে আনে। ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। বিপ্লবের সময় যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার জন্য শাহকে আশ্রয় দেওয়া হয়, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানি ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে।
এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হয়নি। ১৯৮০-র দশকে ইরাককে সমর্থন দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করায় যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়, কিন্তু সরকার পতন হয়নি।
২০১৬ সালের পারমাণবিক চুক্তি, যেটিকে বলা হয় Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA)—এই চুক্তি ভেঙে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। তারপর শুরু হয় নতুন চাপ। উদ্দেশ্য: ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে ফেলা, কূটনৈতিকভাবে একঘরে করা এবং অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল রাখা।
এই হাইব্রিড যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য হলো—একদিকে শান্তির ভান, অন্যদিকে যুদ্ধের হুমকি। যেমন, ২০২৩ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা থাকলেও তার দুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের হামলায় সমর্থন জানায়।
এ কারণে এখন যে কূটনৈতিক শান্তির সংকেত দেখা যাচ্ছে, সেগুলো খুব সহজেই আবার হামলায় রূপ নিতে পারে।
ভেনেজুয়েলা ও ইরান—এই দুটি উদাহরণ দেখায়, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুগলবন্দিতে বহু বছর ধরে গোটা লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে।
এই ছায়া-যুদ্ধের ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়েছে। উন্নয়ন থেমে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে ভয়ের পরিবেশ, উদ্বাস্তু সংকট। এত কিছু করেও তারা শান্তি, নিরাপত্তা বা টেকসই মিত্রতা কিছুই অর্জন করতে পারেনি।
এইসব আচরণ সরাসরি জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেই জাতিসংঘ গঠনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আজ সেই দেশেরই নীতির বিপরীতে দাঁড়িয়েছে এই ছায়া-যুদ্ধ।
এটা এখন কেবল মার্কিন প্রশাসনের নীতি নয়, বরং এক ভয়ংকর মেশিন—যার নাম সামরিক-শিল্প জোট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালে বিদায়ী ভাষণে এই জোট সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এখন সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছে—আরও ভয়ংকর রূপে।
এই যন্ত্র এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মিথ্যা প্রচার আর বেপরোয়া পররাষ্ট্রনীতিতে চালিত হয়।
এখন সময় এসেছে বিশ্বের বাকি ১৯১টি দেশ যেন একযোগে বলে—আর নয়। নয় শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা, নয় একতরফা নিষেধাজ্ঞা, নয় ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, নয় জাতিসংঘ সনদ অস্বীকার।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষও এই দানবীয় নীতির পক্ষে নয়। কিন্তু তাদের কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। তারা চায়—এই নিপীড়ন শেষ হোক, এর আগেই যে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়।
