Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

ট্রাম্পের বিশ্বব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ব্রিটেনের দরকার মুক্তির পথ

Icon

গ্যাবি হিন্সলিফ

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

ট্রাম্পের বিশ্বব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ব্রিটেনের দরকার মুক্তির পথ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একবার বলেছিলেন, যেভাবেই হোক গ্রিনল্যান্ড তার চাই। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি, যুদ্ধ নয়—বরং শুরু হলো আরেকটি অর্থনৈতিক সংঘাত, যার লক্ষ্য ইউরোপের চাকরি ধ্বংস করা এবং তার মনোবল ভেঙে দেওয়া।

এমন এক সময়, যখন ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে ভেবেছিল ভবিষ্যতের হঠাৎ-আঘাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাবে, তখনই তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত দেশটি একরকম ঠান্ডা মাথায় অর্থনীতির উপর আঘাত হানল।

যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই যেমন খুশি, তেমনভাবে আচরণ করতে পারে—এটা যেন নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন ট্রাম্পের হুমকিতে ডেনমার্ক সেনা পাঠাতে বাধ্য হয় গ্রিনল্যান্ডে, তখন হঠাৎ করে মনে হয়, হ্যাঁ, অন্তত সামরিক আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।

কিন্তু ব্যাপারটি যতটা হালকা মনে হচ্ছে, ততটা নয়।

কিয়ার স্টারমার অনেক চেষ্টা করেছেন, যেন যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের মাঝে থেকে কোনো একটিকে খোলাখুলিভাবে বেছে নিতে না হয়। তবে বারবার দেখা গেছে, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র শুধু চায়—‘তুমি পুরোপুরি আমাদের দলে থাকবে, না হয় একেবারেই নয়।’

সাম্প্রতিক এক সামরিক অভিযানে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার একটি ট্যাংকার আটকাতে অংশ নেয়। কিন্তু সেই সমর্থনও যথেষ্ট হয়নি। ব্রিটেন যখন গ্রিনল্যান্ডে প্রতীকীভাবে একজন অফিসার পাঠায় ডেনমার্কের পাশে দাঁড়াতে, তখনই শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ।

এ যেন এক উন্মত্ত ঘোড়ায় চড়ে যাত্রা—দুই দিক সামলাতে গেলে কেউই আর টিকে থাকতে পারে না।

সব মিলিয়ে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—পুরোনো ‘ওয়েস্টার্ন অ্যালায়েন্স’ আর নেই। যুক্তরাষ্ট্র, অন্তত এই প্রেসিডেন্টের অধীনে, আর কোনো নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়।

কেউ যদি ভেবে থাকেন স্টারমার হুট করে তা স্বীকার করবেন, বা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বন্ধ করে দেবেন—তবে বাস্তবতা মেনে নেওয়া জরুরি।

বর্তমানে ইউরোপের প্রথম কাজ হচ্ছে—একটি কৌশল খুঁজে বের করা, যাতে মুখ রক্ষা হয়, চাকরি বাঁচে, আর ইউক্রেনের মতো স্থানে প্রাণহানি ঠেকানো যায়। কারণ ইউক্রেনে এখনো মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন ডাউনিং স্ট্রিটে, আলোচনা হবে কীভাবে সামাল দেওয়া যায় এই টানাপড়েনকে। যদিও ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো চুক্তিই স্থায়ী হয় না, তবুও সময় নেওয়ার জন্য এমন সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

তবে দীর্ঘমেয়াদে, ইউরোপের দরকার এক বিকল্প পথ—একটি ‘প্ল্যান বি’।

যেসব ছোট ছোট গণতান্ত্রিক দেশ মার্কিন নিরাপত্তা, অর্থনীতি কিংবা ইউক্রেন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অনেকটাই বন্দিত্বের মতো অবস্থায় পড়ে যেতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি অনেকটা তাদের মতো, যারা সহিংস সম্পর্কে আটকে আছে। শুরুতে ভাবা যায়, ‘আসলে কিছু হয়নি’, পরে ধীরে ধীরে নিজের মত প্রকাশ করতেও ভয় হয়। কিন্তু যেহেতু রাগী মানুষ সবসময় রেগে যাওয়ার কারণ খুঁজে নেয়, তাই একসময় বুঝতে হয়—বেরিয়ে আসাটাই একমাত্র উপায়।

তবে এমন সম্পর্ক থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে হলে পরিকল্পনা লাগে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছোট দেশগুলোর উচিত হবে—পুরোনো কাঠামো ধ্বংস করার আগে নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জোট গড়ে তোলা।

হয়তো এখান থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন কোনো ইতিবাচক বাস্তবতা। ব্রেক্সিটের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, আর ব্রিটেন আবারও তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার দিকে যেতে পারে—যদিও তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ না-ও হতে পারে।

তবে সবকিছুর চেয়ে কঠিন যে প্রশ্নটি সামনে আসবে তা হলো—অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা খরচ চালাতে গিয়ে, যখন দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখন কে সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে?

এখনকার সম্পর্ক ভাঙা আর একটি বিয়ের সম্পর্ক ভাঙার মতো নয়। কারণ, এখানে শুধু একজন মানুষ নয়—একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক।

ট্রাম্প চিরকাল থাকবেন না। যদি ২০২৮ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রে আরও যুক্তিবাদী কোনো নেতৃত্ব আসে, তাহলে এখনই সম্পর্ক ছিন্ন করা অযৌক্তিক হবে।

তাই পশ্চিমা দেশগুলোর এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কি সাময়িকভাবে হারিয়ে গেছে, না কি পুরো একটা প্রজন্মের জন্যই হারিয়ে গেছে?

যতদিন না এই প্রশ্নের উত্তর মেলে, ততদিন কৌশল হবে—সময়ের জন্য খেলা, কিন্তু একই সাথে প্রস্তুত হতে হবে ‘চুপিচুপি বেরিয়ে যাওয়ার পথ’-এর জন্যও।

গ্যাবি হিন্সলিফ দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন