মার্কিন দখল-হুমকির মুখে গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ডেনমার্কের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে কয়েকটি ইউরোপীয় ন্যাটো দেশ ছোট পরিসরে সেনা মোতায়েন করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি জোরালো করছেন, তখন ইউরোপের বহু পুরনো যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা জোট ন্যাটোর ভেতর সঙ্কট ঘনিয়ে এসেছে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা ডেনমার্ক জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে হামলা হলে তা ন্যাটোর অস্তিত্বের ওপরই আঘাত হবে। বুধবার তারা ঘোষণা দেয়, ‘ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে’ তারা সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
এরপর থেকে জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড জানিয়েছে, তারা এই সপ্তাহেই গ্রিনল্যান্ডে সামরিক বাহিনীর সদস্য পাঠাচ্ছে।
কানাডা ও ফ্রান্সও জানিয়েছে, তারা শিগগিরই গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুুকে কনস্যুলেট খুলবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার জানান, ফরাসি একটি সামরিক দল ইতোমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে অবস্থান করছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই বিমান, নৌ ও স্থল বাহিনী দিয়ে সেই উপস্থিতি আরও জোরালো করা হবে। ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা দুই জন সামরিক কর্মকর্তা গ্রিনল্যান্ডে পাঠাবে।
ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলো একে অপরের দেশে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেয়, যা নতুন কিছু নয়। আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ মহড়া জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বহু বছর ধরেই কাজ করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০ জন সেনা উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক ঘাঁটিতে অবস্থান করছে।
তবে এই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক ঘোষণা কেবল একটি প্রশিক্ষণ নয়—এটি একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা। কারণ ন্যাটোর ভেতরে এই মুহূর্তে যে উত্তেজনা চলছে, তার মধ্যে এটি একজোট হয়ে অবস্থান নেওয়ার স্পষ্ট সংকেত।
শুক্রবার তেল কোম্পানির নির্বাহীদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করবই, তারা চাইলেও না চাইলেও।’ তিনি বলেন, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ তিনি নিতে চান।
বুধবার জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তারা ডেনমার্কের আমন্ত্রণে ১৩ সদস্যের একটি ‘গোয়েন্দা দল’ গ্রিনল্যান্ডে পাঠাচ্ছে, যেটি অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে একটি ‘অন্বেষণ মিশনে’ অংশ নেবে।
সেই দিনই সুইডেনও জানায়, তারা ডেনমার্কের অনুরোধে কিছু সেনা সদস্য গ্রিনল্যান্ডে পাঠিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন জানান, এই সেনারা ‘অপারেশন আর্কটিক এন্ডিওরেন্স’ নামে একটি আসন্ন মহড়ার প্রস্তুতিতে অংশ নেবে।
নরওয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা দুই জন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা পাঠাচ্ছে।
ডাচ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃহস্পতিবার জানান, নেদারল্যান্ডস একজন নৌবাহিনীর অফিসার পাঠাবে এই মহড়ায় যোগ দিতে।
ন্যাটো—অর্থাৎ উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা—৩০টি ইউরোপীয় দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার একটি সামরিক জোট। এর মূলনীতি হলো, একটি দেশের ওপর হামলা মানেই পুরো জোটের ওপর হামলা। তাই ডেনমার্কের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি অনেকটাই নজিরবিহীন।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সম্ভাব্য মার্কিন হামলাকে ‘সম্পূর্ণ কাল্পনিক’ বলেছেন।
আর ট্রাম্প বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড যদি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসে, তাহলে ন্যাটো আরও কার্যকর ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।’
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ রোববার এক্সে লেখেন, তিনি তার ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডিক সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ‘ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি কানাডার অটল সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি গ্রিনল্যান্ড সফর করবেন এবং নুুুকে কানাডার কনস্যুলেট খুলবেন। এ সময় তিনি আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কানাডার ‘গভীর অঙ্গীকার’ প্রকাশ করবেন।

