আল জাজিরার প্রতিবেদন
স্টারলিংক কি ইরানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ভাঙছে? কীভাবে কাজ করে এই সেবা?
ইরানে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে স্টারলিংক বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছে—এমন খবর এখন ছড়িয়ে পড়েছে নানা মাধ্যমে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের এই স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থাই এখন দেশটির আন্দোলনকারী জনগণের জন্য বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ রাখার অন্যতম প্রধান উপায়।
সম্প্রতি সরকার যখন ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তখন ইরানের সাধারণ মানুষ বিকল্প হিসেবে স্টারলিংক ও প্রক্সি সেবাগুলোর শরণ নেয়।
স্টারলিংকের ইরানে কাজ করার জন্য কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। তবে ২০২২ সালে, মাহসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানিদের যোগাযোগ সরঞ্জাম দেওয়ার অনুমতি দেন। সেই সময় থেকে কয়েক হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল গোপনে ইরানে প্রবেশ করে।
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি চান স্টারলিংক ইরানে ইন্টারনেট সেবা চালু রাখুক এবং এ বিষয়ে ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলবেন।
যদিও মাস্ক বা স্টারলিংক আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলেনি, তবে সূত্র বলেছে—ইরানে এখন বিনামূল্যের স্টারলিংক সেবা চালু রয়েছে।
‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ সংগঠনের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেছেন, স্টারলিংকের সহায়তায় আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য বাইরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘এই প্রযুক্তি না থাকলে ইরানে কী ঘটছে, তা জানার কোনো উপায় থাকত না।’
ইরানের সরকার এখনো নিহতের নির্ভরযোগ্য কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে সরকার বলেছে, শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী মারা গেছে। বিরোধীরা বলছে, মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে, যার বেশির ভাগই সাধারণ বিক্ষোভকারী।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা জানায়, এখন পর্যন্ত অন্তত ২,৫৭১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। আল–জাজিরা এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ইরানে নতুন কিছু নয়। ২০১৮ সাল থেকে কমপক্ষে ১৭ বার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞা আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।
২০১৯ সালের জ্বালানির দামবৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরেও কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সীমিতভাবে বন্ধ হয়েছিল। তবে এবারের ব্ল্যাকআউট পুরো দেশজুড়ে এবং অনেক দিন ধরে চলছে।
অ্যামিরি-মোগাদ্দাম বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের নিষেধাজ্ঞা অনেক বেশি বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক কলও সীমিত করে রাখা হয়েছে।
এদিকে ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, সরকারের নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও স্টারলিংক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউক্রেনে যুদ্ধের সময় এই সেবা শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, পরে স্টারলিংকের কিছু অঞ্চল হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
সুদান ও মিয়ানমারের মতো দেশে স্টারলিংক কখনো বিদ্রোহীদের, আবার কখনো অপরাধচক্রের হাতেও পড়েছে। এমনকি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত প্রতারণা চক্রগুলোও স্টারলিংক ব্যবহার করে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
২০২৩ সালে ইরান স্টারলিংকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অভিযোগ তোলে। জাতিসংঘের টেলিকম সংস্থা বিষয়টি খতিয়ে দেখে জানায়, স্টারলিংকের কাজ ইরানে অবৈধ।
অন্যদিকে ইরান সরকার স্টারলিংকের সংকেত জ্যাম করারও চেষ্টা করেছে। আগের ব্ল্যাকআউটে এমনটা দেখা যায়নি।
সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া এক ভিডিও প্রকাশ করেছে, যাতে স্টারলিংক টার্মিনালসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি জব্দ করতে দেখা গেছে। ভিডিওতে এসব যন্ত্রকে ‘ইলেকট্রনিক গুপ্তচরযন্ত্র’ বলা হয়েছে।
স্টারলিংক কাজ করে পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে চলমান হাজারো উপগ্রহের মাধ্যমে। ব্যবহারকারীর হাতে থাকা বিশেষ রিসিভার সেই সিগন্যাল গ্রহণ করে ইন্টারনেট সেবা দেয়। তবে এগুলো সহজেই জ্যাম করা যায়।
ইরানের পরিস্থিতিতে স্টারলিংক একদিকে যেমন মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর সংযোগ রক্ষা করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুলছে। প্রযুক্তি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব—এই তিনের সংঘাত এখন এক জায়গায় এসে ঠেকেছে।

