মিডল ইস্ট আইয়ের মতামত প্রতিবেদন
ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে সতর্ক তুরস্ক, সহিংসতা নয়, সংলাপ চায় আঙ্কারা
রাগিপ সয়লু
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫১ এএম
তেহরানে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নিহতদের স্মরণে ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ইস্তাম্বুলে ইরানি কনস্যুলেটের সামনে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এক নারী। তার মুখে আঁকা ছিল ইরানের জাতীয় পতাকার রঙ। (ইয়াসিন আকগুল/এএফপি)
ইরানে চলমান বিক্ষোভে উদ্ভূত পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক। সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা যাতে গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে না তোলে, সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তিত আঙ্কারা।
তুরস্ক ও ইরান দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী। সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননসহ নানা ইস্যুতে তাদের স্বার্থে বারবার সংঘাত হয়েছে। তবু ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক—এটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে তুরস্ক।
এই অবস্থান স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন সেতা থিংক ট্যাংকের ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক মুস্তাফা জানের। তিনি বলেন, ‘ইরান-তুরস্ক সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকলেও, ইরানের স্থিতিশীলতা তুরস্কের জন্য অগ্রাধিকার।’
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত শনিবার এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেন, চলমান আন্দোলনে স্পষ্ট বার্তা আছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, ইরানের সরকার সেই বার্তা বুঝবে।’
ফিদান মনে করেন, ইরান গত তিন দশকের উচ্চাভিলাষী কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য এখন কঠিন মূল্য দিচ্ছে—পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে একটি তরুণ, গতিশীল জনগোষ্ঠী।
তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপও রয়েছে। মুসাদ এটা লুকায় না। তারা নিজেদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ইরানিদের সরকারের বিরুদ্ধে উঠতে আহ্বান জানায়।’
আঙ্কারার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে তুরস্কের ইরান বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান সেরহান আফাচান বলেন, অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হলেও এখন সহিংস ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এতে যুক্ত হয়েছে, যেমন মসজিদে হামলা।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে সরকার পতনের কথা বলছে, তখন তুরস্ক এমন কোনো অবস্থান নিতে চায় না, যাতে তেহরান ভুল বার্তা পায়।
আফাচান বলেন, ‘আঙ্কারা মূলত ইরানের সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিয়ে নয়। দেশটি যেন বিশৃঙ্খলায় না ডুবে যায়, সেটাই তাদের মূল লক্ষ্য।’
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়াতে যে ভূমিকা নিচ্ছে, তা নিয়েও তুরস্ক অস্বস্তিতে আছে।
২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের সময় শরণার্থী ঢলের আশঙ্কায় তুরস্ক সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়েছিল। তারা তখনই জানিয়ে দেয়, সিরিয়ার মতো এবার আর বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে না।
ইরান সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৮০ লাখ কুর্দি জনগোষ্ঠী রয়েছে। পিকেকে এবং তার ইরানি শাখা পেজাকের তৎপরতা তুরস্কের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্লেষক মুস্তাফা জানের বলেন, ইরানে অস্থিরতা যদি বাড়ে, তাহলে পেজাক তা কাজে লাগিয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে সিরিয়া ও ইরাকে তুরস্কের চলমান অভিযানও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে কুর্দি, বেলুচ ও আরব সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে সহিংসতা এবং সঙ্ঘবদ্ধ বিক্ষোভ তুরস্কের আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।’
তুরস্ক মনে করে, ইরানের জন্য সবচেয়ে ভাল হবে পশ্চিমাদের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলা। ফিদান বলেন, ‘আমরা চাই এমন একটি সমঝোতা হোক, যেখানে সব পক্ষের জয় হয়। কারণ, গোটা অঞ্চলের স্থিতি এটার ওপর নির্ভর করছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন ইরানের উচিত হবে আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা ও মীমাংসার পথ খোঁজা।’ এই প্রক্রিয়ায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান ভূমিকা রাখতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
