আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ভেনেজুয়েলায় কী পরিমাণ তেল আছে? আর কী কী খনিজ আছে দেশটিতে?
হান্না দুগল এবং মারিয়াম আলি
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনার পর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, তারা দ্রুত দেশটির তেল উৎপাদন ফের চালু করতে চায় এবং খনিজ খাত সম্প্রসারণে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় রয়েছে লোহা, খনিজ, সব রকম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একসময় তারা এই খাতে সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন সবকিছুতে ধুলো পড়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটা ফিরিয়ে আনবেন।’
বিশ্বে প্রমাণিত সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। ২০২৩ সালের হিসাবে দেশটিতে তেলের মজুদ ছিল ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা যুক্তরাষ্ট্রের মজুদের পাঁচগুণের বেশি।
ভেনেজুয়েলা ১৯৬০ সালে ইরাক, ইরান, কুয়েত ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে ওপেক গঠন করে। দেশটির তেল রিজার্ভ মূলত অরিনোকো বেল্ট অঞ্চলে, যা পূর্ব ভেনেজুয়েলায় অবস্থিত এবং প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা।
এই অঞ্চল থেকে উত্তোলিত তেল অতিরিক্ত ঘন এবং ভারী হওয়ায় তা তুলতে খরচ বেশি পড়ে এবং পরিশোধনও কঠিন। ফলে এ তেল সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের শেলের হালকা তেলের তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়।
এই ভারী তেল পরিশোধনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে।
একসময় ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী ছিল। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত তারা।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় কোম্পানির অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন গড়ে ৯৫২,০০০ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭৮৩,০০০ ব্যারেল।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে দেশটির তেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৭.৫২ বিলিয়ন ডলার।
গত এক দশক ধরে চীনই ভেনেজুয়েলার প্রধান তেল ক্রেতা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ শুরুর আগেই চীন প্রতিদিন ৭৭৮,০০০ ব্যারেল তেল আমদানি করে, যা দেশটির রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় স্থানে কিউবা।
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসেও ভেনেজুয়েলা সমৃদ্ধ। ২০২৩ সালের হিসাবে, দেশটির মজুদ ছিল প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার, যা দক্ষিণ আমেরিকার মোট গ্যাস রিজার্ভের ৭৩ শতাংশ।
তাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের বেশিরভাগই তেলের উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রায় ৮০ শতাংশ গ্যাস, তেল উত্তোলনের উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হয়।
ভেনেজুয়েলা লাতিন আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের সরকারি রিজার্ভ রাখে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রিজার্ভ প্রায় ১৬১.২ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
২০১১ সালে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ ‘অরিনোকো মাইনিং আর্ক’ নামে একটি প্রকল্প ঘোষণা করেন, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন খনিজ সম্পদ খুঁজে বের করা এবং জাতীয়করণ করে রপ্তানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
২০১৬ সালে মাদুরো সেই প্রকল্প এগিয়ে নেন। দেশের প্রায় ১২ শতাংশ অঞ্চলকে খনির জন্য নির্ধারিত করা হয়, যেখানে হীরা, কপার, নিকেল ও কোলটান রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
২০১৮ সালে মাদুরো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেন ‘গোল্ড প্ল্যান’ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তবে কোনো বিনিয়োগ কার্যকর হয়নি। বেশিরভাগ খনি এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
২০১৮ সালের এক সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে অন্তত ৬৪৪ মেট্রিক টন সোনার মজুদ আছে, যদিও সরকার বলেছে, প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে।
