Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

তেহরানে দমন-পীড়নের পর হাসপাতালজুড়ে ‘দেহের স্তূপ’

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৬ এএম

তেহরানে দমন-পীড়নের পর হাসপাতালজুড়ে ‘দেহের স্তূপ’

তেহরানের রাস্তায় গত কয়েকদিনে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু সেই বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকেনি। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তারা নৃশংস সহিংসতা দেখেছেন। এক নারী বলেছেন, একটি হাসপাতালে তিনি দেখেছেন ‘দেহ একের পর এক স্তূপ করে রাখা হয়েছে’।

বয়স ৬৫ ও ৭০ ছুঁইছুঁই এমন দুই ব্যক্তি জানান, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সব বয়সী মানুষ রাস্তায় ছিলেন। তবে শুক্রবার রাতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সশস্ত্র বাহিনী অনেক মানুষকে গুলি করে হত্যা করে বলে তারা জানান।

এই বিক্ষোভ শুরু হয় ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজার এলাকায়, মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে ১০০-র বেশি শহরে, হয়ে ওঠে বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ইরানি শাসকদের জন্য।

তেহরানের অন্য এক এলাকায় আন্দোলনকারীরা জানান, তারা একজন আহত বৃদ্ধকে সাহায্য করেছিলেন, যার শরীরে ৪০টির মতো গুলি ঢুকে গিয়েছিল। হাতটিও ভেঙে গিয়েছিল। তাকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, সব জায়গায় ছিল ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা’।

অন্য অনেকে বলেছেন, এমন বিপুল মানুষের সমাগম এর আগে তারা কখনও দেখেননি।  

তবে শুক্রবার রাতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এক টেলিভিশন ভাষণের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কঠোর দমন-পীড়ন শুরু হয়।

একজন আন্দোলনকারী বলেন, ‘এই শাসকগোষ্ঠী হয়তো বাইরে থেকে কোনো চাপ ছাড়া হাল ছাড়বে না।’

তেহরানের এক সমাজকর্মী বলেন, তিনি একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তা ‘দুঃস্বপ্নে’ রূপ নেয়।

তিনি বলেন, ‘গুলির শব্দ, টিয়ার গ্যাস, যা ভাবা যায় সবই ছোড়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, একজন তরুণীকে ঘাড়ে বিদ্যুতের শক দেওয়া হয়েছিল—জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত। তার সহকর্মীর ছেলেও নিহতদের মধ্যে একজন।

শিরাজ শহরে এক চিকিৎসাকর্মী জানান, এক নারীর মাথা ও ঘাড়ে গুলি লাগে। এমন দৃশ্য তিনি জীবনে দেখেননি।

নেইশাবুরে একজন চিকিৎসক জানান, ভবনের ওপর থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। 

নজাফাবাদে আহতদের নেওয়া হয় মনতাজেরি হাসপাতালে। সেখানে একটি সূত্র জানায়, ‘অনেক পরিবার এসে তাদের সন্তানের লাশ নিয়ে যায়, যেভাবে ছিল, সেভাবেই কবর দেয়।’

চিকাগোতে বসবাসরত তেহরানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক মোহাম্মদ লেসানপেজেশকি জানান, তার বন্ধুরা বলছেন, ইরানি হাসপাতালগুলো বিক্ষোভকারী আতদের চাপ সামলাতে পারছে না।

তিনি বলেন, এক অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ তাকে জানান, জরুরি বিভাগে অন্তত ৩০ জন শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছিল।

ফারাবি আই হাসপাতালে ২০০-৩০০ জনের চোখে গুলির ছররা ঢুকে গেছে—এমন ঘটনাও জানানো হয় তাকে।

একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, বিক্ষোভের ১৪ দিনে অন্তত ১১৬ জনের লাশ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৩৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

অন্তত ২,৬৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত দেশের ৩১টি প্রদেশের ১৮৫টি শহরের ৫৭৪টি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।

বাহারেস্টান এলাকায় শনিবার ১০০ জনকে ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দাঙ্গার নেতৃত্ব’ দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানায় স্থানীয় এক কর্মকর্তা।

তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ করায় ক্ষোভ বেড়েছে, বরং বেশি মানুষ রাস্তায় নামছে।

তার ভাষায়, ‘মানুষ এখন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হয়। সবাই জানালা থেকে স্লোগান দেয়, রাস্তায় জড়ো হয়। আন্দোলনের গতি আর থামছে না।’

তিনি জানান, আন্দোলনের শুরুর কারণ ছিল মূল্যস্ফীতি, কিন্তু এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরও বেড়ে গেছে। ডিম, দুধের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ইরানের সেনাবাহিনী প্রধান আমির হাতামি জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র রুখতে ঐক্য প্রয়োজন।’

খামেনি আন্দোলনকারীদের ‘ধ্বংসের পেছনে থাকা লোক’ বলে অভিহিত করেন।

সূত্র: সিএনএন

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন