আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
ইরানে কি ট্রাম্পের ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতির বাস্তবায়ন সম্ভব
জাসিম আল-আজ্জাউয়ি
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
৪ জানুয়ারি ২০২৬, তেহরানের একটি ভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিলবোর্ড প্রদর্শিত হচ্ছে [মাজিদ আসগারিপুর/ডব্লিউএএনএ, রয়টার্সের মাধ্যমে]
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বললেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘পুরো প্রস্তুত’—এই হুঁশিয়ারিতে একটা আলাদা তীব্রতা ছিল। এর ঠিক পরদিনই কারাকাসে অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী, যেখানে তার বিরুদ্ধে ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ’ অভিযোগে মামলা চলছে।
ভেনেজুয়েলায় হুমকি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ট্রাম্প এখন ইরানকে মানসিক চাপে রাখছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই মন্তব্যকে ‘উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তেহরান যে বার্তাটি বুঝেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে ইরান আর ভেনেজুয়েলা এক নয়। যেটা কারাকাসে সম্ভব হয়েছে, তেহরানে সেটার পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়।
ভেনেজুয়েলায় সাফল্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল। প্রায় ছয় মাস ধরে সিআইএ সেখানকার ভেতরকার যোগাযোগ গড়ে তোলে। মাদুরোর খুব কাছের একজনের মাধ্যমে তার গতিবিধি অনুসরণ করা হয়। তারপর শনিবার ভোরে কারাকাসের আশপাশে মার্কিন বিমান হামলা হয়, এবং বিশেষ বাহিনী তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়।
এই অভিযান সফল হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর বিশৃঙ্খল অবস্থা। এমনকি রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্রদের কাছ থেকেও তেমন কোনো সহায়তা পাননি মাদুরো।
কিন্তু ইরান সেই অর্থে একটি সহজ টার্গেট নয়—তা গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘর্ষেই প্রমাণিত হয়েছে।
ইসরায়েল যখন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হত্যা করে, পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের টার্গেট করে, তখনো তেহরান ভেঙে পড়েনি। তাদের ‘রেভল্যুশনারি গার্ড’ বা আইআরজিসি পাল্টা হামলা চালিয়ে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে।
এই সহনশীলতা এসেছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি থেকে। আইআরজিসির মালিকানাধীন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ, টেলিকম এবং রপ্তানি খাতে বিস্তৃত—এই কাঠামো তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় গভীর স্বার্থ জড়িত করেছে।
ইরান এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি। তাদের সক্রিয় ও রিজার্ভ মিলিয়ে সেনা সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। শুধু আইআরজিসির সদস্যই দেড় লাখের বেশি। এর বাইরে আছে ‘বাসিজ’ মিলিশিয়া—যাদের সদস্য সংখ্যা কয়েক লাখ।
ভূগোলও এখানে বড় একটি বিষয়। ইরানের পাহাড়ি ভূমি ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো ইরাক বা ভেনেজুয়েলার মতো নয়। সেখানে অভিযান চালানো আরও জটিল ও বিপজ্জনক।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া ও চীনের অবস্থান। ভেনেজুয়েলার মতো ইরানকে একা ফেলে দেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বরং তেহরানকে উন্নত অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
গত কয়েক দিনে ইরানে বিক্ষোভ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা এখনো ২০২২ সালের আন্দোলনের মতো তীব্র নয়। যদিও অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন, এখনো সেনাবাহিনীতে কোনো ভাঙন দেখা যায়নি।
ইতিহাস বলছে, বাইরের হস্তক্ষেপ সমাজকে বিভক্ত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ করে। ইসরায়েলের উস্কানির পরও গত গ্রীষ্মে সাধারণ মানুষ সরকারের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি।
যদিও দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে বিতর্ক এবং সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্য ও উত্তরসূরি প্রশ্ন নিয়ে উদ্বেগ আছে, এসব এখনো দীর্ঘমেয়াদি সংকট। তাৎক্ষণিক ভেঙে পড়ার মতো নয়।
এ কারণেই কারাকাসের অভিজ্ঞতা ইরানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভেনেজুয়েলা ছিল একপ্রকার শূন্য খোলস; সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করা গেছে। কিন্তু ইরান একটি জটিল রাষ্ট্র কাঠামো—যেটি বহু দশকের অভিজ্ঞতায় গড়ে উঠেছে।
তেহরানে সামরিক অভিযান চালানোর অর্থ হবে এই পুরো অঞ্চলকে এক গভীর, দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংকটে ঠেলে দেওয়া। তাই ট্রাম্প ইরানে যা চাচ্ছেন, তা বাস্তবায়ন অসম্ভবের কাছাকাছি।
