ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ: বিশ্বের জন্য তিনটি সতর্কবার্তা
দ্য কনভারসেশন
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
ভেনেজুয়েলায় গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া আদেলা ফ্লোরেস দে মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানটি যেমন দুঃসাহসিক, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি স্পষ্ট অবৈধ পদক্ষেপ। এর চেয়েও বিস্ময়কর হলো—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছেন, তারা সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে এবং দেশটির বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিতে চায়।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যতই বিতর্কিত হোক বা মাদুরো সরকারের রেকর্ড যতই প্রশ্নবিদ্ধ হোক না কেন, আন্তর্জাতিক আইনের চোখে ভেনেজুয়েলা এখনো একটি স্বীকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌম অধিকার। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল দখলের যেকোনো মার্কিন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইনের আরেকটি গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবেই বিবেচিত হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো যুক্তি হাজির করেনি। বরং ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি একটি নতুন কৌশল হলেও, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এর কোনো বৈধ ভিত্তি নেই।
আন্তর্জাতিক বিষয়কে অভ্যন্তরীণ আইনের আওতায় আনার কৌশল
প্রথম ও দ্বিতীয়—উভয় ট্রাম্প প্রশাসনই মাদুরো সরকারের প্রতি চরম বৈরিতা প্রদর্শন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রধানত দুটি অভিযোগ সামনে এনেছে— এক, অবৈধ লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা। দুই, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারে ভেনেজুয়েলার সম্পৃক্ততা।
এই দুটি বিষয়ই ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ইস্যু ছিল এবং ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা)’ আন্দোলনের মূল ভিত্তি। এছাড়া মাদুরো সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল ছিল বিতর্কিত। তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো দেশের সরকার কতটা বৈধ—তা সামরিক হস্তক্ষেপের আইনগত ভিত্তি হতে পারে না।
তবুও ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় তাদের সামরিক অভিযানের বৈধতা দেখাতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন ব্যবহার করছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্র্যান্ড জুরি মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে যে মামলা করেছিল, সেটিই এখন এই অভিযানের মূল ভিত্তি।
নিউইয়র্কে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে একজন সাধারণ বন্দির মতো মাদুরোকে হাজির করানো—এই পুরো ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনের প্রাধান্যই স্পষ্ট করে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে তার নিজ দেশের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ থেকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া—আন্তর্জাতিক ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন ঘটনা।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে একাধিক ফৌজদারি অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। যদিও তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তি পাওয়ার কথা, ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রেসিডেন্সির বৈধতা স্বীকার না করায় সেই সুরক্ষা কার্যত বাতিল বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চালিয়ে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে মার্কিন আদালতগুলোও খুব একটা মাথা ঘামাবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, গ্র্যান্ড জুরি অভিযোগ প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে প্রত্যর্পণের আবেদন করতে পারত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল—ভেনেজুয়েলা সেই আবেদন উপেক্ষা করবে। তাই তারা সরাসরি সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে কারাকাসে মাদুরোর বাসভবনে অভিযান চালায় এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার করায়।
আইন প্রয়োগ, না কি আইন ভাঙা?
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি অভিযানের মূল ভিত্তিই হলো—নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগের যুক্তি। গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে ছোট নৌযানগুলোকে লক্ষ্য করে সমুদ্রে সামরিক হামলা শুরু করে। এসব হামলার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী আইন প্রয়োগের অংশ, যা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কার্যরত কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে।
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার আটক ও জব্দ করা শুরু করে, যেগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। আন্তর্জাতিক জলসীমা ও ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি এসব অভিযানও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের আইনের বৈধতা দেখিয়ে চালিয়েছে। এখন সেই আইন প্রয়োগের পরিধি গিয়ে ঠেকেছে—একটি সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার ও আটক করার পর্যায়ে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তারা কেবল নিজেদের আইনই কার্যকর করছে। এই যুক্তির মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক আইনকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে নিজেদের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।
এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘এক্সসেপশনালিজম’ বা ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই মনে করে, তাদের নিজস্ব আইন অন্য সব আইনের ঊর্ধ্বে। আন্তর্জাতিক আইন যেন তাদের জাতীয় স্বার্থ বাস্তবায়নের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়—এই মানসিকতাই এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সমালোচনা বা চাপ তৈরি হবে, তা তারা সামাল দিতে পারবে বা উপেক্ষা করতে পারবে।
নজরে রাখার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো—
প্রথমত, ট্রাম্প প্রশাসন দেখিয়ে দিয়েছে—নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তারা যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশ, আইন কিংবা সরাসরি সামরিক শক্তি—সবই ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বহু দেশ ও সংস্থা এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও, বাস্তবে জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায় অক্ষম। এর কারণ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা এবং ট্রাম্পের জাতিসংঘবিরোধী মনোভাব।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে এই ব্যতিক্রমী আইন প্রয়োগের ফলাফল নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার মতো দুর্বল প্রতিরোধের বদলে শক্ত প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়, তাহলে ইউরোপ ও কানাডার ক্ষেত্রে ন্যাটো চুক্তি এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে অ্যানজাস চুক্তি সক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি এই হস্তক্ষেপমূলক নীতির পথে এগিয়ে চলে, তাহলে এর পরিণতি শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিশ্বের বহু প্রান্তেই তার ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে।
