তেল, রাজনীতি ও প্রতিবেশ—ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা পরিকল্পনা
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে সেই দেশের প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করলেন এবং দেশটি সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিলেন, তখন অনেকেই বিস্মিত হল।
কারণ তিনি নিজেই বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রনায়কদের বিদেশে হস্তক্ষেপের নীতির সমালোচনা করে এসেছেন। তার প্রতিশ্রুতি ছিল—‘বিদেশি ঝামেলায় জড়াবেন না।’
এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দেশটি চালাবে, যতদিন না সেখানে ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিবেচনাপূর্ণ’ পরিবর্তন সম্ভব হয়। তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি—এই হস্তক্ষেপ কতদূর পর্যন্ত যাবে। তবে তার কথায় ইঙ্গিত ছিল, আরও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা আছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে এনে মাদক চোরাচালানের মামলায় আদালতে তোলা হয়েছে। এই হামলা ছিল ট্রাম্পের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক অভিযান। রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়।
কয়েকজন রিপাবলিকান ধারণা করেছিলেন, ট্রাম্প এবার বেশি গুরুত্ব দেবেন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যেমন—জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতি। কিন্তু এই পদক্ষেপ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে যায় না। তবুও ট্রাম্প বলছেন, এটা তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিরই অংশ। তিনি বলেন, ভালো প্রতিবেশী, স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি ঘিরে থাকতে চান। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের দিকে ইঙ্গিত ছিল তার।
তবে তার দলের অনেকেই এই হস্তক্ষেপ নিয়ে দ্বিধান্বিত। কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করছেন। তিনি বলেছেন, “যারা ‘ম্যাগা’ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, তারা আসলে ভেবেছিল এসব যুদ্ধ আর হবে না। আমরা ভুল ছিলাম।”
এই ঘটনার ফলে ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের সমালোচনার সুযোগ পাচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকির মুখে, আর ট্রাম্পের এমন বিদেশে জড়িয়ে পড়া রিপাবলিকানদের জন্যও নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সেনেটের বিরোধীদলীয় নেতা চাক শুমার বলেছেন, “মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক, কিন্তু কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সামরিক হামলা চালানো বিপজ্জনক এবং দায়িত্বহীন।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়া যায় না।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অনেক কংগ্রেস সদস্যকে ফোন করে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। সেনেটর মাইক লি প্রথমে বিরোধিতা করলেও পরে মত বদলান।
তবে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি বলেছেন, প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ সংবিধানসম্মত নয়। তার মতে, যদি আইন মেনে চলা হতো, তাহলে একজন রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করার মতো নাটকীয়তা থাকত না।
অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ১৯৮০-৯০ দশকের রিপাবলিকানদের সঙ্গে তার পররাষ্ট্রনীতির মিল বাড়িয়েছে। যেমন, রোনাল্ড রেগান গ্রেনাডা এবং জর্জ এইচডব্লিউ বুশ পানামায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিলেন, যারা মাদুরোর মতোই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অপরাধী ছিলেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ দূত এলিয়ট আব্রামস বলছেন, “মাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প ঠিক কাজ করেছেন। তবে এখন দেখার বিষয়, তিনি কি ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।” তিনি স্বীকার করেন, ‘ভেনেজুয়েলা চালানো’ আসলে কী বোঝায়, তা তিনিও জানেন না।
প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ওবামার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি দীর্ঘ ও জটিল রূপান্তর প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে যাচ্ছে। তার মতে, ভেনেজুয়েলায় জড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আশপাশের দেশগুলো নিয়েও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

