ট্রাম্পের ভাষ্য: ‘ভেনেজুয়েলা এখন আমরাই চালাব’
নিকোলা মাদুরো
ভোর নামার আগেই তীব্র আলো, বিস্ফোরণ আর হেলিকপ্টারের শব্দে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ অভিযানে সেদিন বদলে যায় ইতিহাস।
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলা মাদুরোকে তার ‘নিরাপদ ঘাঁটি’ থেকে ধরে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্স। অভিযানে তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ বলে বর্ণনা করেন।
কারাকাসে চালানো এই হামলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বহু এলাকায়। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হন—তাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও ছিলেন। কাতিয়া লা মার অঞ্চলের এক আবাসিক ভবনে বোমা বর্ষণে মারা যান ৮০ বছরের রোজা গঞ্জালেস ও তার পরিবার।
মাদুরোকে হেলিকপ্টারে করে ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থানরত ইউএসএস আইডব্লিউও জিমা নামের এক মার্কিন যুদ্ধজাহাজে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। প্রথমে তাকে রাখা হয় গুয়ান্তানামো বে ঘাঁটিতে, পরে নেওয়া হয় স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড ঘাঁটিতে।
নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে তার চোখ বাঁধা, হাতকড়া পরা ছবি প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই। এরপর হেলিকপ্টারে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে। যদিও স্ত্রী সিলিয়ার অবস্থান এখনো নিশ্চিত নয়।
হোয়াইট হাউসের র্যাপিড রেসপন্স অ্যাকাউন্ট থেকে মাদুরোর একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায়—কালো হুডি পরে তিনি একটি করিডোর ধরে হাঁটছেন। ভিডিওর ওপরে লেখা ছিল ‘পার্প ওয়াক’, অর্থাৎ ‘অপরাধীকে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, এখন থেকে ভেনেজুয়েলা সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করবে। বড় বড় তেল কোম্পানিকে দিয়ে দেশের ভাঙাচোরা অবকাঠামো মেরামতের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এমন একটা হামলা করেছি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কেউ দেখেনি।’
তবে ট্রাম্পের এই অবস্থান বিশ্বজুড়ে নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতারা একে ‘বেপরোয়া সামরিক আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দেন। সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘এটি খোলাখুলি সাম্রাজ্যবাদ।’ লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশও এর বিরোধিতা করেছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস এই হামলাকে ‘অবৈধ ও জবরদস্তিমূলক অপহরণ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা কখনোই কারো উপনিবেশে পরিণত হবে না—না পুরনো সাম্রাজ্যের, না আধুনিক সাম্রাজ্যের, না পতনশীল সাম্রাজ্যের।’
দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানায়, মাদুরোর অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রদ্রিগেসকেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে হবে।
ডেলসি রদ্রিগেস একজন আইনজীবী, জন্ম কারাকাসে। তার পিতা ছিলেন বামপন্থি গেরিলা যোদ্ধা। নিজে অর্থমন্ত্রী ও তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন দেশটির নেতৃত্বের ভার তার কাঁধে।
অবশ্য, এই পুরো অভিযানকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়ে গেছে। ট্রাম্প বলছেন, তারা ‘প্রয়োজনে আরও বড় হামলার’ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ ব্যয় করবে না, বরং খরচ উঠবে ‘ভূপৃষ্ঠের নিচের সম্পদ’ থেকেই—ইঙ্গিত ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের দিকে।
এদিকে, কারাকাসসহ একাধিক রাজ্যে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভেনেজুয়েলার জনগণের একাংশ এই হস্তক্ষেপে ক্ষুব্ধ, অন্যরা হয়তো নিরব প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছেন—এই পরিবর্তনের পর সত্যিই কি কিছু বদলাবে?

