Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

চীনের সামরিক মহড়া ঘিরে তাইওয়ানে উত্তেজনা, দ্বীপজুড়ে সতর্কতা ও প্রতিক্রিয়া

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৪৭ পিএম

চীনের সামরিক মহড়া ঘিরে তাইওয়ানে উত্তেজনা, দ্বীপজুড়ে সতর্কতা ও প্রতিক্রিয়া

তাইওয়ানের চারপাশে সোমবার বড় আকারের লাইভ ফায়ার সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীন। ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামে এ মহড়ায় সেনা, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও গোলাবারুদের পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্র লক্ষ্যবস্তুতে হামলার অনুশীলন করা হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাইওয়ান সেনাবাহিনী প্রস্তুতি নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন করে আক্রমণ প্রতিহতের অনুশীলন চালায়।

চীনের পূর্ব থিয়েটার কমান্ড জানিয়েছে, তারা তাইওয়ান প্রণালীর উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সেনা জড়ো করে অভিযান চালিয়েছে। এ মহড়া মঙ্গলবারও চলবে, যাতে দ্বীপটির প্রধান বন্দর অবরোধ এবং চারপাশ ঘিরে ফেলার অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

একজন সিনিয়র তাইওয়ান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনের ডজনখানেক সামরিক জাহাজ ও বিমান তাইওয়ানের চারপাশে অবস্থান করছে, যাদের কিছু ‘ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীপটির ২৪ নটিক্যাল মাইলের সীমানার কাছে চলে এসেছে।’

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করার পর এ নিয়ে চীন ষষ্ঠবারের মতো বড় সামরিক মহড়া চালালো। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে রয়েছে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির এক বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেন, তাইওয়ানের ওপর চীনের সম্ভাব্য হামলা জাপানের সামরিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।

এই মহড়া শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাইওয়ানের জন্য ১১.১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেওয়ার ১১ দিন পর। এটি তাইওয়ানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এর প্রতিবাদ জানায় এবং হুঁশিয়ারি দেয় যে তারা ‘জোরালো প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এসব মহড়া এখন আর শুধু নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ নয়; বরং এগুলো একটি সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে—যার উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আগাম সতর্কতা না দিয়ে আকস্মিক হামলা চালানো।

চীনের পূর্ব থিয়েটার কমান্ডের মুখপাত্র শি ই বলেন, ‘এই মহড়া তাইওয়ান স্বাধীনতা-পন্থি গোষ্ঠী ও বাইরের হস্তক্ষেপকারীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা।’

তাইওয়ান সরকার এই মহড়ার নিন্দা জানিয়েছে। তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হিমার্স রকেট সিস্টেমসহ বিভিন্ন অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। এই উচ্চ গতিসম্পন্ন আর্টিলারি ব্যবস্থা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

তাইওয়ানের উপকূলরক্ষী বাহিনী জানায়, চীনা উপকূলরক্ষী জাহাজের তৎপরতার জবাবে তারা বড় আকারের জাহাজ মোতায়েন করেছে এবং সমুদ্রপথ ও মাছ ধরা এলাকাগুলোতে মহড়ার প্রভাব যেন না পড়ে সে লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করছে।

তাইওয়ানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, চীন তাইপেই আকাশসীমায় ১০ ঘণ্টার জন্য একটি ‘অস্থায়ী বিপজ্জনক এলাকা’ ঘোষণা করেছে। তারা বিকল্প ফ্লাইট রুট চিহ্নিত করতে কাজ করছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় চীনের দুটি যুদ্ধবিমান ও ১১টি যুদ্ধজাহাজ তাইওয়ানের আশেপাশে চলাচল করেছে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তাইওয়ান সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই অনুশীলনের লক্ষ্য হচ্ছে—যদি চীন কোনো একসময় হঠাৎ করে একটি মহড়াকে বাস্তব হামলায় রূপ দেয়, তাহলে দ্রুত সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা তৈরি রাখা।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর সব সদস্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ রক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

এই মহড়ার কোনো প্রভাব তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে পড়েনি। বরং সোমবার সকালে সূচক ০.৮ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।

তাইপেইয়ের তরুণ শিক্ষক লিন ওয়েই-মিং বলেন, ‘আমি মনে করি, এসব মহড়ার উদ্দেশ্য আমাদের ভয় দেখানো। আগেও এমন হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের সরকারকে, আমরা সাধারণ মানুষ শুধু অপেক্ষা করতে পারি।’

তাইওয়ান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, চীনের কথিত সার্বভৌমত্ব তারা মানে না। দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এখানকার জনগণ।

চীনা সামরিক বাহিনী ‘শিল্ডস অব জাস্টিস: স্ম্যাশিং ইল্যুশন’ এবং ‘অ্যারোজ অব জাস্টিস: কন্ট্রোল অ্যান্ড ডিনায়েল’ নামে দুটি পোস্টার প্রকাশ করেছে। আরেকটি গ্রাফিকে দ্বীপটির চার জায়গায় লক্ষ্যবস্তুতে টার্গেট করা অবস্থায় দেখানো হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানায়, এই মহড়ার একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো—তাইওয়ানের উত্তর দিকের কিলুং এবং দক্ষিণ দিকের সবচেয়ে বড় বন্দর কাওসিউং অবরোধ করা।

গত বছরের মহড়ায় চীন এই বন্দরে অবরোধ অনুশীলন করলেও এবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বলছে—এটা বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর কৌশল।

জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর চীনের বার্তা জোরদার হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একসময় বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাইওয়ানের ‘চীনে প্রত্যাবর্তন’ ছিল বেইজিংয়ের বৈশ্বিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রথম পোস্টারে দেখা যায়, চীন তাদের বেসামরিক জাহাজগুলো ব্যবহার করছে, যেগুলো অ্যামফিবিয়াস হামলায় ব্যবহার করা সম্ভব।

পোস্টারে লেখা ছিল, ‘ন্যায়বিচারের ঢাল স্পর্শ করলে ধ্বংস অনিবার্য! বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যদি এই ঢালের সামনে পড়তে হয়, তাহলে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে!’

তাইওয়ানের নাগরিক স্টেফানি হুয়াং বলেন, ‘ওদের লক্ষ্য হচ্ছে—‘দ্বীপটা দখল করো, মানুষ নয়’। তারা শুধু নিজেদের মুখরক্ষা করতে চায়। কিন্তু আমরা তাইওয়ানিরা তা মানি না। আমরা আমাদের মতো, তারা তাদের মতো।’

সূত্র: রয়টার্স

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন