Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারে ভোট হচ্ছে, ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৪৫ পিএম

মিয়ানমারে ভোট হচ্ছে, ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর, মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনের প্রথম ধাপে নেইপিদোতে ভোট দিয়ে আঙুলে কালি দেখাচ্ছেন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। [ছবি: সাই আউং মেইন/এএফপি]

মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি-র নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার প্রায় তিন বছর পর রোববার এই ভোট শুরু হয়।

তবে এই নির্বাচন পুরো দেশের মধ্যে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় ভোট হচ্ছে। অনেক অঞ্চলেই তুমুল সংঘাতের কারণে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে এখনো চলমান গৃহযুদ্ধ এই অচলাবস্থার পেছনে বড় কারণ।

প্রথম দফা ভোটের পর ১১ ও ২৫ জানুয়ারি আরও দুটি ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে ৬৫টি টাউনশিপে ভোট পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।

এভাবে অন্তত ২০ শতাংশ জনগণ এই নির্বাচনের বাইরে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক টনি চেং। তিনি ইয়াঙ্গুন থেকে জানান, শহরগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কেমন হয় সেটিই এখন দেখার বিষয়।

রোববার ভোর ৬টায় ইয়াঙ্গুনে ভোটকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়া হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভোটার কেন্দ্রে আসতে দেখা যায়। তবে তাদের বেশিরভাগই মধ্যবয়সী। তরুণদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। ব্যালটে বিকল্পও খুবই সীমিত। প্রায় সব প্রার্থীই সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ দলগুলোর।

সমালোচকরা এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য বলছেন না। জাতিসংঘ, কিছু পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে—এই ভোটে বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি।

২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হলেও অং সান সু চি ও তার দল জাতীয় লীগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) পরবর্তীতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অং সান সু চি এখনো আটক রয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতেই সেনাবাহিনীঘনিষ্ঠ ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) সবচেয়ে বড় দল হিসেবে জয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সেনাবাহিনী বলছে, এই নির্বাচন মিয়ানমারের জন্য নতুন এক সূচনা হতে পারে। তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশকে স্থিতিশীল করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এই নির্বাচনকে ‘মিলনের পথে একটি পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

রাজধানী নেইপিদোয় সাধারণ পোশাকে এসে সেনাপ্রধান নিজেই ভোট দেন এবং উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সাংবাদিকদের সামনে আঙুলে ভোটের কালি দেখান।

তবে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি টম অ্যান্ড্রুজ এই নির্বাচনকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

তার মতে, ‘‘যে সামরিক জান্তা সাধারণ মানুষকে বোমা মেরে হত্যা করছে, বিরোধী নেতাদের কারাগারে রাখছে এবং মতপ্রকাশকে অপরাধ বানিয়েছে—তাদের আয়োজন করা নির্বাচন কোনোভাবেই নির্বাচন হতে পারে না। এটি বরং অস্ত্রের মুখে পরিচালিত একটি প্রহসন।’’

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে সহিংসতায় প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ। মানবিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের।

রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ২২ হাজারের বেশি মানুষ রাজনৈতিক কারণে বন্দি রয়েছেন।

ইয়াঙ্গুন শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এই মেশিনে ভোট নষ্ট বা প্রার্থী লিখে দেওয়ার সুযোগ নেই।

নির্বাচনে প্রথম দিকে ভোট দিতে আসেন ৪৫ বছর বয়সী সোয়ে মাও। তিনি বলেন, ‘কে কী বলছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। পছন্দ-অপছন্দ থাকবেই।’

তবে মান্দালয়ের বাসিন্দা মোয়ে মোয়ে মিয়ান্ত বলেন, ‘‘এই নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু হতে পারে না। যারা আমাদের জীবন ধ্বংস করেছে, তাদের নির্বাচনকে আমরা কীভাবে সমর্থন করব? আমরা এখন ঘরহীন, জঙ্গলে লুকিয়ে আছি। প্রতিদিনই জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে হাঁটছি।’’

ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার নির্ধারিত কোনো সময় এখনো জানানো হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের চলমান সংকটের মধ্যে সেনাবাহিনীর এই প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা গঠনের চেষ্টা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এই সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবে—এমন সম্ভাবনাও কম।

আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর বিশ্লেষক রিচার্ড হর্সি লিখেছেন, ‘ফলাফল নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইউএসডিপি জিতবে, সেনা শাসনই চলবে—সামান্য একটি বেসামরিক মুখোশের আড়ালে। কিন্তু এতে সংকট মিটবে না, বরং রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়বে এবং ব্যর্থতা আরও গভীর হবে।’

সূত্র: আল জাজিরা

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন