আল-জাজিরার প্রতিবেদন
১এমডিবি মামলায় দোষী নাজিব রাজাক: কী জানা গেল
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে কুয়ালালামপুর হাই কোর্ট। শুক্রবার দেওয়া রায়ে বহুল আলোচিত ও বহু বিলিয়ন ডলারের ১এমডিবি কেলেঙ্কারির মামলায় তাকে দোষী ঘোষণা করা হয়।
৭২ বছর বয়সী নাজিবের বিরুদ্ধে চারটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও ২১টি অর্থপাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এসব অভিযোগ মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ”তহবিল ১এমডিবি” থেকে ২.২ বিলিয়ন রিঙ্গিত (প্রায় ৫৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অবৈধভাবে সরানোর সঙ্গে জড়িত।
প্রতিটি অভিযোগের শাস্তি হিসেবে ১৫ থেকে ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে, যদিও এখনো তার সাজা ঘোষণা করা হয়নি।
এটি ছিল নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিচারপ্রক্রিয়া, যা একই কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয়। প্রথম মামলা শুরু হয় ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে। সেই মামলায় ২০২০ সালে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থপাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১২ বছরের কারাদণ্ড পান। পরে একটি আংশিক ক্ষমার মাধ্যমে তার সাজা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়।
এই কেলেঙ্কারিতে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে তুলে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ নাজিবের কাছেও পৌঁছায়। দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা এই বিচারপ্রক্রিয়ায় দুই মামলায় মোট ৭৬ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন, যাদের একজন ছিলেন নাজিব নিজেও।
নাজিব ও তার সমর্থকেরা বারবার দাবি করে আসছেন, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তিনি তার উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। আদালতের বাইরে শুক্রবারও তার সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে বিচারক কলিন লরেন্স সিকুইরাহ বলেন, ‘আসামির দাবি যে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অথবা ডাইনি শিকার, তা পুরোপুরি ভ্রান্ত। কঠোর ও নির্ভুল প্রমাণ দেখিয়েছে, তিনি ১এমডিবিতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং ব্যাপক প্রভাব খাটিয়েছেন।’
১এমডিবি (১মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ) ২০০৯ সালে গঠিত একটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন তহবিল, যার লক্ষ্য ছিল বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। তখন নাজিব রাজাক মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, একইসঙ্গে ১এমডিবির উপদেষ্টা বোর্ডের প্রধানও ছিলেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, তিনি এসব পদমর্যাদা ব্যবহার করে তহবিল থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন।
বর্তমানে নাজিব মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর রাজ্যের কাজাং কারাগারে বন্দী। ২০২৮ সালের ২৩ আগস্ট তার মুক্তি পাওয়ার কথা।
দ্বিতীয় মামলার তদন্তে জানা যায়, ১এমডিবি তহবিল থেকে পাওয়া অর্থ তিনি বিলাসবহুল জাহাজ ‘ইক্যুয়ানিমিটি’ কেনা, অন্য উচ্চমূল্যের সম্পত্তি কেনা এবং ‘দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট’ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় করেন।
নাজিব ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হন মাহাথির মোহাম্মদের কাছে, যিনি একসময় তাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। নাজিব সব সময় অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি তহবিল কেলেঙ্কারি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আসা অর্থ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। আদালতে তিনি দাবি করেন, এটি প্রয়াত সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর দেওয়া অনুদান ছিল। তবে বিচারক শুক্রবার তার এই বক্তব্যও খণ্ডন করেন।
তিনি আরও বলেন, ১এমডিবির সঙ্গে জড়িত উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা তাকে প্রতারিত করেছিলেন। এর মধ্যে মালয়েশীয় ধনকুবের জো লো ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী, যিনি এখনো পলাতক।
এক চিঠিতে নাজিব লেখেন, ‘অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার সময়েই ১এমডিবি কেলেঙ্কারি ঘটে গেছে—এটা ভাবলেই প্রতিদিন আমার কষ্ট হয়। এই ঘটনার জন্য আমি মালয়েশিয়ার জনগণের কাছে নিঃশর্তভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

