ইরাককে পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র কি এক মহা জুয়ার ঘরে হাঁটছে?
ফিরাস এন. দাব্বাঘ
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৫৬ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্ক সাভায়াকে ইরাক প্রজাতন্ত্রে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। [ছবি: mark_savaya / ইনস্টাগ্রাম]
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নতুন করে গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগের মতো সামরিক আগ্রাসন নয়—এবারের পরিকল্পনায় রয়েছে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, নিরাপত্তা জোরদার এবং শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা।
এই কৌশলের মূলকেন্দ্রে রয়েছে ইরাককে ‘আবার বিখ্যাত’ করে তোলার অঙ্গীকার। ট্রাম্পের বিশেষ দূত মার্ক সাভায়া বলেন, তাদের লক্ষ্য ইরাককে যুদ্ধক্ষেত্র নয়, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা।
পুরনো পদ্ধতির ‘অন্তহীন যুদ্ধের’ পরিবর্তে এবার যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এমন এক বাস্তবমুখী সম্পর্ক, যেখানে বিনিয়োগ, পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা থাকবে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এর মাধ্যমে তারা ইরাকে সব ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য কমিয়ে বৈধ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
কিন্তু বাস্তবতা বেশ কঠিন।
ইরাক এখন অনেকটা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত একটি ভাঙা কাঠামোর মতো। নির্বাচনে জয় পাওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরকারের বাইরে থেকেও ক্ষমতার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও ভয় পাচ্ছে।
দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু বাহিনী নয়, রাজনৈতিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন দরকার। অথচ বহু দল এখনো নিজেদের স্বার্থ ও সম্পদের দখল নিয়ে বেশি আগ্রহী। ফলে ইরাকের সরকার এক ধরনের স্থবিরতায় ভুগছে।
এই পটভূমিতে, মার্ক সাভায়াকে গত ১৯ অক্টোবর ইরাকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি একজন ব্যবসায়ী, রাজনীতিক নন। তার পরিচয়—একজন ইরাকি বংশোদ্ভূত আমেরিকান যিনি ডেট্রয়েটে ক্যানাবিস শিল্পে কাজ করেছেন এবং ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ছিলেন।
সাভায়া আগে একটি আলোচিত ঘটনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখেন—ইসরায়েলি-রুশ গবেষক এলিজাবেথ সুরকভকে ইরাকি মিলিশিয়া দুই বছরের বেশি সময় ধরে আটক রেখেছিল, পরে তাকে ছাড়িয়ে আনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সাভায়া।
তার ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং জাতিগত পরিচয়ের কারণে তিনি এমন অনেক রাজনৈতিক জায়গায় প্রবেশাধিকার পেয়েছেন, যেখানে সাধারণ কূটনীতিকদের পক্ষে যাওয়া কঠিন।
তবে ইরাকে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইরানের প্রভাব। তেহরান এই দেশটিকে কেবল প্রতিবেশী নয়, একটি কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখে। শিয়া গোষ্ঠীগুলোর একত্রে থাকা নিশ্চিত করতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
সম্প্রতি সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন, লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বলতা—এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরান এখন চাপে আছে। তাই বাগদাদে প্রভাব ধরে রাখাই তাদের শেষ চেষ্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্কের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও ইরাকের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে এগিয়ে এসেছে। কেউ কেউ বাণিজ্য চায়, কেউ আবার কুর্দিদের প্রভাব কমাতে চায়।
এই নানা স্বার্থের মাঝেই মার্ক সাভায়ার কৌশল—সবাইকে এক সুতোয় বাঁধা, যাতে ইরাক একদিকে শান্তি ফিরে পায়, আবার অন্যদিকে ইরানের প্রভাবও সীমিত হয়।
এই লক্ষ্যে সাভায়া বলছেন, ‘একটি সত্যিকারের স্বাধীন ইরাকে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীদের কোনো জায়গা নেই।’ তার আহ্বানে ইতোমধ্যে ইরানঘনিষ্ঠ অন্তত তিনটি গোষ্ঠী অস্ত্র ছাড়ার কথা জানিয়েছে, যদিও অনেকেই এখনো রাজি হয়নি।
তবে এই কৌশল অনেক ঝুঁকিপূর্ণও। ইরান যদি এটিকে হুমকি মনে করে প্রতিক্রিয়া দেয়, তাহলে আবার সংঘাত শুরু হতে পারে। কারণ, ইরাকি মিলিশিয়ারা এখনো শক্তিশালী এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অর্থ, অস্ত্র এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠী।
সবশেষে, ইরাকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরেই—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই মিলিশিয়াদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে পারবে? পারে কি তারা এমন এক শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে, যেটি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করবে?
যদি পারে, তাহলে ‘মেইক ইরাক গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগান শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও সফল হবে। না হলে ইরাক হয়তো আরও একবার পরিণত হবে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে—যেখানে স্বার্থ, প্রভাব আর প্রতিপত্তির লড়াই চলতেই থাকবে।
