আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ট্রাম্প কেন ভ্রমণকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য চাইছেন, কীভাবে কাজ করবে এই নিয়ম?
সারাহ শামীম
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৫৯ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে চাওয়া কিছু বিদেশিকে তাদের বিগত পাঁচ বছরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্য দিতে হতে পারে। এই প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
এই নিয়মটি প্রযোজ্য হবে তাদের জন্য, যাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ভিসার প্রয়োজন পড়ে না।
এই পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল রেজিস্টার’-এ। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) কর্তৃপক্ষ এই তথ্য সংগ্রহ করবে ভিসা মওকুফ পাওয়া দেশের ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে।
এই পদক্ষেপটি ট্রাম্প কর্তৃক জানুয়ারি ২০২৫-এ স্বাক্ষরিত নির্বাহী আদেশ ১৪১৬১-এর অংশ। এই আদেশের মূল উদ্দেশ্য— ‘বিদেশি সন্ত্রাসী ও জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিসমূহ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করা।’
এই নিয়ম কাদের জন্য?
এই শর্ত প্রযোজ্য হবে ‘ইলেকট্রনিক সিস্টেম ফর ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইএসটিএ)’ ব্যবহারকারীদের জন্য, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা মওকুফ কর্মসূচির আওতায় ভ্রমণ করেন।
এই কর্মসূচির আওতায় ৪২টি দেশের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা বা ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, কাতার, গ্রিস, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, মাল্টা ও ইসরায়েল।
বর্তমানে ইএসটিএ আবেদনকারীদের সীমিত কিছু তথ্য দিতে হয়, যেমন বাবা-মায়ের নাম, বর্তমান ইমেইল ঠিকানা এবং কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকলে তার বিবরণ। তবে ২০১৬ সাল থেকে একটি ঐচ্ছিক প্রশ্ন রাখা হয়, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য চাওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে এটি আবশ্যিক করা হচ্ছে।
নতুন নিয়ম কীভাবে কাজ করবে?
এই নিয়ম কার্যকর হলে, আবেদনকারীদের বিগত পাঁচ বছরে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ইউজারনেম’ বা ‘হ্যান্ডল’ দিতে হবে। তবে ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড বা লগইন তথ্য দিতে হবে না। কর্তৃপক্ষ কেবল প্রকাশ্য প্রোফাইল ঘেঁটে তথ্য বিশ্লেষণ করবে।
এ ছাড়া আরও কিছু ব্যক্তিগত তথ্য বাধ্যতামূলক হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিগত পাঁচ বছরে ব্যবহৃত সব ফোন নম্বর এবং গত ১০ বছরে ব্যবহৃত সব ইমেইল ঠিকানা।
এছাড়া ইএসটিএ আবেদন ফর্মে ‘উচ্চ-মূল্যের তথ্য ক্ষেত্র’ যোগ করার কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে থাকতে পারে প্রার্থীর পরিবারের সদস্যদের বিশদ তথ্য, জন্মস্থান, ফোন নম্বর, বায়োমেট্রিক তথ্য—যেমন আঙুলের ছাপ, ডিএনএ এবং চোখের মণির তথ্য।
তবে প্রশাসন এখনো জানায়নি, তারা কোন ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য খুঁজবে বা কেন এই তথ্য প্রয়োজন।
এই নিয়ম কবে থেকে চালু হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে ফেডারেল রেজিস্টারে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষ ৬০ দিনের মধ্যে এই প্রস্তাব সম্পর্কে মতামত দিতে পারবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই সিদ্ধান্ত কেন এখন?
২০১৯ সাল থেকেই, যেসব দেশের নাগরিকরা ভিসা মওকুফের আওতায় পড়েন না, তাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য চাওয়া হয়। এই প্রস্তাব সেটির সম্প্রসারণ। ট্রাম্প প্রশাসন এই নীতি চালু করে, এবং পরবর্তী সময়ে বাইডেন প্রশাসনও তা বজায় রাখে।
কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন এবং ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়ম আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে, যেসব মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব, অভিবাসন বা অন্য কোনো সুবিধা চাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের আইনজীবী ক্যারোলিন ডেসেল বলেন, ‘এই প্রস্তাব কার্যকর হলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যই নয়, বরং ইমেইল, ফোন নম্বর ও বায়োমেট্রিক তথ্যও দিতে হবে। ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় বড় ধরনের হস্তক্ষেপ হবে।’
তিনি আরও বলেন, অনেকে ছদ্মনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন—তাদের জন্য এটি আরও বেশি উদ্বেগজনক।
‘এই প্রস্তাব যদি নাগরিকত্ব ও অভিবাসনের জন্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে চাওয়া প্রায় প্রতিটি বিদেশি নাগরিককেই অনির্দিষ্টকালের জন্য অনলাইনে নজরদারির আওতায় আনা হবে।’ এমন মন্তব্য করেন ডেসেল।
এমনকি যারা তাদের আত্মীয়দের নাগরিকত্ব বা অভিবাসনের জন্য আবেদন করেন, তারাও এই নজরদারির আওতায় পড়বেন।
কী প্রভাব পড়বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী, প্রত্যেকের মতপ্রকাশ, ধর্ম পালন, সংবাদ প্রচার ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রয়েছে।
ডেসেল সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই নিয়ম বাস্তবায়ন হলে মানুষ অনলাইনে মুক্তভাবে মত প্রকাশ করতে ভয় পাবে। ফলে অনেকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগ্রহও হারাবে।
‘এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় এক ভয়াবহ আঘাত’, বলেন ডেসেল।
