Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

দ্য গার্ডিয়ান প্রতিবেদন

ট্রাম্প প্রশাসনকে দেখে ক্রমেই যেন একটি অপরাধী চক্রের মতো মনে হচ্ছে

Icon

জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩২ পিএম

ট্রাম্প প্রশাসনকে দেখে ক্রমেই যেন একটি অপরাধী চক্রের মতো মনে হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ক্যারিবিয়ানে মাদকবাহী সন্দেহভাজন নৌকায় হামলার প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ১৬ নভেম্বর ২০২৫, সেন্ট পিটার্সবার্গ, ফ্লোরিডা। ছবি: ডেভ ডেকার/জুমা প্রেস ওয়্যার/শাটারস্টক

ট্রাম্প প্রশাসনকে দেখে ক্রমেই যেন একটি অপরাধী চক্রের মতো মনে হচ্ছে। আর এখন, অনেকে বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও উঠেছে। যদিও ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলাটাও হয়তো একধরনের ছাড় দেওয়া।

বৃহস্পতিবার খবর আসে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ছোট নৌকায় হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছে। এই নিয়ে মাদকবাহী নৌকায় চালানো ২২টি হামলায় অন্তত ৮৭ জন নিহত হলেন। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই নৌকাগুলো ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে অবৈধ মাদক বহন করছিল।

এই অভিযান মাসের পর মাস ধরে চলছে। তবে সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে হওয়া প্রথম হামলার তথ্য প্রকাশ করে ওয়াশিংটন পোস্ট যখন বিষয়টি সামনে আনে, তখনই তা রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি করে। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে নৌকাটিকে একবার লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এরপর যখন দুইজন আহত ব্যক্তি ভাঙা নৌকার পাশে ভেসে ছিল, তখন দ্বিতীয়বার গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ নাকি তখন মুখে বলেছিলেন, ‘সবারে মেরে ফেলো’।

এই ঘটনার তদন্ত এখন কংগ্রেসে চলছে। এমনকি অনেক রিপাবলিকান সদস্যও এই হামলাকে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে দেখছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের নিজস্ব যুদ্ধনীতি নির্দেশিকায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে, ‘যারা আহত, অসুস্থ বা জাহাজডুবিতে বেঁচে আছে, তাদের সব অবস্থায় সুরক্ষা দিতে হবে।’ শুধু নিয়ম নয়, মানবিকতার বোধেও এমন আচরণ নিষিদ্ধ।

ট্রাম্পপন্থীরা অবশ্য বলছেন, হেগসেথ সবাইকে মেরে ফেলার কোনো স্পষ্ট নির্দেশ দেননি। তারা দাবি করছেন, পানিতে থাকা ব্যক্তিরা তখনও ‘লড়াইয়ে ছিল’—হয়তো তারা আশপাশে থাকা অন্য মাদক পাচারকারীদের সাহায্য চেয়েছিল। তবে ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্য, গোপন ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, পানিতে ভেসে থাকা, ভয়াবহ অবস্থায় থাকা লোকদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। নৌকাটি ধ্বংস হয়েছিল, কোনো হুমকিই তারা আর তৈরি করতে পারেনি।

যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে এটা যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু এখানে তো কোনো যুদ্ধই নেই। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষায়, এই নৌকাগুলো ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিলসহ মারাত্মক মাদক পাচার করে, আর যারা এগুলো চালায় তারা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’র সদস্য। তাই যুক্তরাষ্ট্র এই ‘ড্রাগ যুদ্ধ’-কে আসল যুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু যুদ্ধের নিয়ম এভাবে তৈরি হয় না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর সারাহ ইয়াগার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চাইলেই একটি যুদ্ধ তৈরি করতে পারেন না।’ যুদ্ধ ঘোষণা করতে হলে কংগ্রেসের অনুমতি দরকার—ট্রাম্প সেটা মেনে নেন না। তার দাবি করা এই শত্রুপক্ষ আসলে সামরিক হুমকি নয়। এরা ছোট ছোট নৌকা, কারও কাছে অস্ত্র নেই। এদের মোকাবেলা পুলিশি অভিযান দিয়েই করা উচিত ছিল, যেভাবে আগের প্রশাসনগুলো করত।

সেপ্টেম্বরের ওই ‘ডাবল অ্যাটাক’ শুধু একদিনের ঘটনা নয়। মাসের পর মাস ধরে ৮৭ জনকে হত্যার এই পুরো অভিযানের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ইয়াগারের ভাষায়, ‘সেই নৌকাগুলোর কারোরই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কর্তৃক নিহত হওয়ার কোনো বৈধতা নেই।’ সোজা ভাষায়, এগুলো যুদ্ধাপরাধ নয়, বরং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড—যাকে আমরা খুন বলি।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটির মুখে প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথ কী করলেন? তিনি একটি শিশুতোষ বইয়ের ভুয়া প্রচ্ছদ তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলেন। সেখানে দেখা যায়, জনপ্রিয় চরিত্র ‘ফ্র্যাংকলিন’ হাতে রকেট লঞ্চার নিয়ে মাদক পাচারকারীদের দিকে তাক করে আছে। বইটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্র্যাংকলিন টার্গেটস নার্কো টেররিস্টস’। এটা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির আচরণ নয়।

ট্রাম্প প্রশাসন অনেক আগেই মানদণ্ড হারিয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু এই প্রশাসন যেন নতুন গভীরতায় ডুবে যাচ্ছে।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের আচরণ ইউরোপীয়দের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। তিনি সম্প্রতি এমন এক শান্তি পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যেটি রীতিমতো রাশিয়ার দাবি-তালিকার মতোই শোনায়। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ, স্টিভ উইটকফের একাধিকবার মস্কো সফর ও পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এই সন্দেহকে আরও উস্কে দেয়।

অনেকে মনে করতেন, পুতিনের কাছে হয়তো ট্রাম্পের কোনো গোপন তথ্য আছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, এ সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে অর্থ।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, মিয়ামি ও অন্যান্য জায়গায় গোপন বৈঠকে উইটকফ ও পুতিনের প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিয়েভ একটি ‘বড় চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হবে, এবং যুক্তরাষ্ট্র পাবে খনিজসম্পদ-ভিত্তিক বিশাল মুনাফার ভাগ।

জ্যারেড কুশনারও মস্কো সফরে উইটকফের সঙ্গে ছিলেন। হোয়াইট হাউসে কাজ করার সময় যেসব গালফ দেশের সঙ্গে তিনি চুক্তি করেছিলেন, পরে সেখান থেকেই তার বিনিয়োগ তহবিলে শত শত কোটি ডলার ঢুকেছে। ট্রাম্পের জগতে ব্যক্তিগত ও সরকারি স্বার্থ আলাদা নয়—সরকারি সুযোগ মানেই ব্যক্তিগত লাভ।

সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ ছিল গ্রীষ্মে সারডিনিয়া উপকূলে এক সুপারইয়টের বৈঠক। সেখানে ছিলেন উইটকফ ও আরব আমিরাতের এক রাজপুত্র, যার নিয়ন্ত্রণে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ। মে মাসে ঘোষণা আসে, সেই রাজপুত্রের কোম্পানি ট্রাম্প-উইটকফ পরিবারের তৈরি ক্রিপ্টো ফার্মে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। দুই সপ্তাহ পরেই হোয়াইট হাউস আমিরাতকে এমন এআই চিপ রপ্তানির অনুমতি দেয়, যা আগে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে নিষিদ্ধ ছিল।

এই দুটি ঘটনার সময় ও সম্পর্ক দেখে বোঝা যায়, কাকতালীয় ঘটনা নয়। গোপনে কত কিছু ঘটে চলেছে—তার প্রমাণ যেন প্রতিটি স্তরে মেলে।

‘দুর্নীতি’ শব্দটি শুধু ঘুষ নয়, এটা নীতির ক্ষয়, মানবিকতার বিলুপ্তি। ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠরা যদি কোনোদিন সত্যিকার জবাবদিহির মুখে পড়ে, তাহলে তাদের সামনে আসবে এই একটি শব্দই—সব অর্থে, সব ওজনে: দুর্নীতি।

জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড গার্ডিয়ান-এর নিয়মিত কলাম লেখক এবং গার্ডিয়ান পলিটিক্স উইকলি আমেরিকা পডকাস্টের উপস্থাপক। তিনি বিবিসি রেডিও ৪-এর দ্য লং ভিউ অনুষ্ঠানও পরিচালনা করেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি অরওয়েল পুরস্কার পেয়েছেন।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন