‘প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’: ইউরোপের চরম ডানপন্থার পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য সমর্থন
অগাস্টে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: আলেকজান্ডার দ্রাগো/রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বলেছে, ইউরোপ আগামী দুই দশকের মধ্যে ‘সভ্যতার বিলুপ্তির’ মুখোমুখি হতে পারে—অভিবাসন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একীভবনের কারণে।
নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল সংক্রান্ত একটি নীতিপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউরোপের বর্তমান গতিপথের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ গড়ে তোলা’ জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল শিরোনামের ওই নথিটি একটি ‘রোডম্যাপ’ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে বলা হয়েছে—‘আমেরিকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ও স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখার’ লক্ষ্য নিয়েই এটি তৈরি।
ট্রাম্পের স্বাক্ষরযুক্ত প্রস্তাবনায় ইউরোপের ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি স্পষ্ট সমর্থন জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইউরোপ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক সংকটেও রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারণে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ছে, অভিবাসন ইউরোপকে পাল্টে দিচ্ছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে এবং জাতীয় পরিচয়ের বিলুপ্তি ঘটছে।
৩৩ পৃষ্ঠার এই দলিলে স্পষ্টভাবে বর্ণবাদী ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ইউরোপের অনেক দেশ ‘অ-ইউরোপীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ’ হয়ে উঠছে। ‘বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ বছরের মধ্যেই ইউরোপের চেহারা অচেনা হয়ে যাবে।’
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের করণীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—‘ইউরোপের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ সৃষ্টি’, ইউরোপকে তার নিজের প্রতিরক্ষা ব্যয় বহনের জন্য উৎসাহ দেওয়া এবং ইউরোপীয় বাজারগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়েডেফুল এই দলিল সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হলেও, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমাজ পরিচালনার মতো বিষয়ে ইউরোপের বাইরে থেকে পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
হোয়াইট হাউস থেকে বৃহস্পতিবার রাতে প্রকাশিত এই নীতিপত্রটি ইউরোপের ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের গভীর সম্পর্কের বার্তা দেয়। দলিলটিতে বলা হয়েছে, ‘সত্যিকার গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রতিটি ইউরোপীয় জাতির ইতিহাস ও বৈচিত্র্যের উদ্যাপন’ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।
বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি দল সরকারে, জোটে বা জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। নীতিপত্রে এসব দলকে ‘দেশপ্রেমিক শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘তাদের উত্থান আশাব্যঞ্জক’।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও ইউরোপের কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে জার্মানির ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ অন্যতম। সেপ্টেম্বরে দলের একজন শীর্ষ নেতা হোয়াইট হাউসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
অভিবাসন নিয়ে ওই নীতিপত্রে আবারও ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্বের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, ‘কোনো কোনো ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশে কয়েক দশকের মধ্যেই অ-ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে।’
দলিলটিতে বলা হয়েছে, ইউরোপকে ‘ইউরোপীয়’ রূপে টিকে থাকতে হবে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে হবে এবং ‘নিয়ন্ত্রননির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি’ ত্যাগ করতে হবে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কেও এখানকার ‘দুর্বলতা’ স্পষ্ট বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত অবসান চায়—যা বাস্তবে রাশিয়ার পক্ষে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই নীতিপত্রে বলা হয়েছে, ইউরোপের কিছু সরকার দুর্বল সংখ্যালঘু ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং বিরোধী মতকে দমন করছে। তাদের যুদ্ধ সম্পর্কে ‘অবাস্তব’ প্রত্যাশার কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠা বিলম্বিত হচ্ছে।
এই দলিল প্রকাশের ঘণ্টা কয়েক আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না দিয়েই ইউক্রেনকে ভূখণ্ডের প্রশ্নে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে’।
এদিকে, নথির ভাষা অনেকাংশে মিলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যের সঙ্গে, যিনি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনা করেন—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব, অবৈধ অভিবাসন বন্ধে ব্যর্থতা এবং জনমতের প্রতিফলন না ঘটানোর অভিযোগে।
নীতিপত্রে স্বীকার করা হয়েছে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্য বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি স্তম্ভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধির জন্য তা অপরিহার্য।
এছাড়া বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে কাজ করতে চায়—যারা নিজেদের ‘পুরোনো গৌরব’ ফিরে পেতে চায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জিন শাহিন এই পরিকল্পনাকে ‘বিপর্যস্ত ও পরস্পরবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে বলছে, আর অন্যদিকে রুশপন্থি কট্টর-ডানপন্থিদের উসকে দিচ্ছেন। এটি দ্বিচারিতা।”
“এই কৌশল তথাকথিত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির কথা বললেও রাশিয়া ও চীনের হুমকিকে এড়িয়ে গেছে,”—যোগ বলেন শাহিন।

