জাতিসংঘের রিপোর্ট
মিয়ানমারে মেথ ও আফিম উৎপাদন এক দশকে সর্বোচ্চ
মিয়ানমারে এই বছর আফিম চাষ গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটি যখন গৃহযুদ্ধে জর্জরিত, তখনও অবৈধ মাদকের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে টিকে আছে—জাতিসংঘের এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে তালেবান কর্তৃপক্ষের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পর সেখানকার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার এখন বৈশ্বিক অবৈধ আফিম সরবরাহের প্রধান উৎস হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) প্রকাশিত ‘মিয়ানমার আফিম জরিপ ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশটিতে আফিম চাষের জমির পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩,১০০ হেক্টরে। এটি ২০১৫ সালের পর সর্বোচ্চ।
ইউএনওডিসি মিয়ানমারকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেথামফেটামিন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। তুলনামূলকভাবে সহজ উৎপাদন প্রক্রিয়া থাকায় মেথ তৈরি করা হয় শিল্পকারখানার মতো পরিবেশে এবং তা ট্যাবলেট ও ক্রিস্টালরূপে স্থল, নৌ ও আকাশপথে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে।
আফিম গাছের ফুল থেকে সংগ্রহ করা এই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত হয়ে তৈরি হয় মরফিন ও হেরোইন। দেশজুড়ে দারিদ্র্য ও অস্থিরতার মধ্যে পড়া বহু কৃষক এখন এই চাষেই ঝুঁকছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই মিয়ানমারে যুদ্ধ চলছে।
আফিমের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এর মূল্যবৃদ্ধি। এখন প্রতি কেজি তাজা আফিমের দাম প্রায় ৩২৯ ডলার, যেখানে ২০১৯ সালে ছিল মাত্র ১৪৫ ডলার। এই বাজারের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪১ মিলিয়ন থেকে ১.০৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, যা ২০২৪ সালের দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ০.৯ শতাংশ থেকে ১.৪ শতাংশ।
জরিপে বলা হয়েছে, কৃষিকাজে সংঘাতের প্রভাব পড়ায় গড় ফলন ১৩ শতাংশ কমলেও চাষের জমি বাড়ার কারণে মোট উৎপাদন এক শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০১০ মেট্রিক টনে।
গত বছর সামান্য হ্রাস পেলেও এ বছর এই বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে, মিয়ানমারের মাদক ব্যবসা আবারও শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল মূলত গৃহযুদ্ধের কারণে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ইউএনওডিসির প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ বলেন, ‘মিয়ানমার এক সংকটপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আফিম চাষে এই ব্যাপক বৃদ্ধি বোঝায়, বিগত কয়েক বছরে কতটা পুনর্গঠিত হয়েছে এই অবৈধ অর্থনীতি। ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়ার ইঙ্গিতও দেয়।’
এছাড়া, জরিপে আরও জানানো হয়, আফগানিস্তানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় মিয়ানমার থেকে ইউরোপে হেরোইন পৌঁছানোর নতুন সঙ্কেতও পাওয়া গেছে। গত এক বছরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপগামী যাত্রীদের মাধ্যমে এমন বেশ কয়েকটি চালান ধরা পড়েছে।
যদিও এই চালানগুলোর পরিমাণ বড় নয়, তবে এটি অঞ্চলের বাইরেও চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। আফগানিস্তানের ঘাটতি পূরণে মিয়ানমারের হেরোইনই নতুন উৎস হয়ে উঠছে।
ডেলফিন শান্টজ আরও বলেন, ‘নিরবিচ্ছিন্ন সংঘাত, বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও মুনাফার আকর্ষণে কৃষকেরা আফিম চাষে ঝুঁকছেন। যদি তাদের জন্য টেকসই বিকল্প জীবিকা তৈরি না হয়, তাহলে দারিদ্র্য আর অবৈধ চাষের এই চক্র আরও গভীর হবে।’
উত্তর-পূর্ব মিয়ানমার হলো ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এলাকার অংশ, যেখানে মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত একত্রে মিলেছে। এই অঞ্চল বহুদিন ধরে আফিম ও হেরোইনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত।
এর পেছনে অন্যতম কারণ, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলার অভাব। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ খুবই দুর্বল, আর নানা জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র গ্রুপগুলো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

