Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেই পুতিনের ভারত সফর: আলোচনায় কী কী থাকছে?

Icon

যশরাজ শর্মা

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৫ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেই পুতিনের ভারত সফর: আলোচনায় কী কী থাকছে?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোর ক্রেমলিন প্রাসাদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘অর্ডার অব সেন্ট অ্যান্ড্রু দ্য অ্যাপোস্টল দ্য ফার্স্ট-কল্ড’ সম্মাননায় ভূষিত করেন, ৯ জুলাই ২০২৪ [এভজেনিয়া নভোজেনিনা/রয়টার্স]

চার বছরের বেশি সময় পর আবারও ভারত সফর করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটাই তার প্রথম ভারত সফর।

এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সম্পর্ক কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের পুরনো ঘনিষ্ঠতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন রাশান তেলের আমদানি বৃদ্ধি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ করে এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেয়।

এই পরিস্থিতিতে, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা ভারতের জন্য আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত কোনো নির্দিষ্ট জোটে জড়িত না হয়ে নিজস্ব নীতিতে চলার চেষ্টা করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় দেশটি নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। তবে বাস্তবে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছাকাছি চলে যায়। শীতল যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দৃঢ় করে, আবার রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বও ধরে রাখে।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। পুতিনের এবারের সফর একদিকে বন্ধুত্বের বার্তা, অন্যদিকে এটি দেখার বিষয়—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কীভাবে এই সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রাখবেন, সংঘাত না বাড়িয়ে।

পুতিনের এই সফর শুরু হবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনে একটি ঘরোয়া নৈশভোজের মধ্য দিয়ে সফরের সূচনা হবে।

পরদিন সকালে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন, সেখানে গার্ড অব অনার এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তিনি মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাবেন।

এরপর হায়দরাবাদ হাউসে মোদি ও পুতিনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে দুই দেশের মধ্যে নানা চুক্তি ও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে রুশ প্রতিনিধি দল ভারতের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে দেখা করবেন। রাতে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আয়োজিত ভোজসভায় যোগ দেবেন পুতিন।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, এই সফর ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’, যা রাশিয়া-ভারত সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ পর্যায়ে নতুন মাত্রা দেবে।

পুতিনের সঙ্গে আসবেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন্দ্রেই বেলুসভ, এবং অস্ত্র, জ্বালানি ও শিল্প খাতের এক বিশাল প্রতিনিধি দল। থাকবেন রুশ রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক সংস্থা ‘রোসোবোরোন এক্সপোর্ট’-এর কর্মকর্তারা এবং তেল-গ্যাস কোম্পানি রসনেফট ও গ্যাজপ্রম নেফটের শীর্ষ নির্বাহীরাও।

সফরের সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ভারত-রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্বের ২৫ বছর পূর্তির সময়। ২০০০ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিতভাবে বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এক বছর ভারত সফর করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, আরেক বছর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যান রাশিয়ায়।

তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর এই ঐতিহ্য থেমে যায়। ওই বছর মোদির রাশিয়া যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ২০২৩ সালে পুতিন দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেননি, কারণ তখন তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

২০২৪ সালে সেই ধারাবাহিকতা আবার শুরু হয়েছে। জুলাইয়ে মোদি রাশিয়া সফর করেছেন, আর এবার পুতিন ভারত সফরে।

এই সফরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক। রাশিয়া চাইবে ভারত আরও ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান কিনুক। অন্যদিকে ভারত চাইবে জ্বালানি, কৃষিপণ্য, ওষুধ ও যন্ত্রাংশ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিন এই সফর থেকে শুধু কূটনৈতিক নয়, দৃশ্যমান সাফল্যও তুলে ধরতে চান। তিনি বিশ্ববাসীকে দেখাতে চান, রাশিয়া একা নয়, এখনও বন্ধু আছে।

যদিও এই দৃশ্যমান সম্পর্কের পেছনে কিছু বড় সমস্যা রয়ে গেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল কেনা এখন সংকটে পড়েছে।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ভারত হঠাৎ করেই রাশান তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রও নীরবে ভারতের এই পদক্ষেপে সমর্থন দিয়েছিল। কারণ বিশ্ববাজারে তেলের দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে, সে লক্ষ্যেই ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনতে থাকে।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিষয়টা পাল্টে গেছে। তিনি ভারতীয় পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছেন—প্রথমে ২৫ শতাংশ, পরে তা ৫০ শতাংশ করেন।

এরপর অক্টোবর মাসে রাশিয়ার দুটি বড় তেল কোম্পানি রসনেফট ও লুকওইল-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প। এমনকি যেসব দেশ তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করছে, সেসব দেশকেও শাস্তির হুমকি দেন।

ফলে ভারতের রিলায়েন্স কোম্পানি ঘোষণা করে, রাশিয়ার তেল ব্যবহার করে তৈরি করা পণ্য আর রপ্তানি করবে না। এর ফলে ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানি বাড়ানোর নতুন চুক্তিও করেছে। প্রতিরক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে, যাতে ভারত রাশিয়ার পরিবর্তে তাদের কাছ থেকে আরও বেশি সরঞ্জাম কেনে।

তবে ভারতের কৌশল স্পষ্ট—সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কাউকে খুশি করতে গিয়ে অন্য কাউকে না হারানো।

‘ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর বিশ্লেষক প্রভীন দন্তি বলেন, “ভারত চায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার জবাব দিতে, একই রকম চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও করে। অনেকগুলো এমন চুক্তি ইতোমধ্যেই প্রক্রিয়াধীন।”

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলাস্কায় পুতিনকে লাল গালিচায় অভ্যর্থনা জানাবে, আবার ভারতকে তিরস্কার করবে—এটা দ্বিচারিতা।”

এই সফরে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদার হতে পারে। বর্তমানে ভারত যে অস্ত্র আমদানি করে, তার প্রায় ৩৬ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। ২০১০ সালে এই হার ছিল ৭২ শতাংশ।

ভারত ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পে জোর দিচ্ছে এবং পশ্চিমা দেশ থেকেও সরঞ্জাম কিনছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যৎ কয়েক বছরেও রাশিয়া ভারতের প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার হয়ে থাকবে।

গত মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের আকাশযুদ্ধে ভারত ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে। বিমান বাহিনী প্রধান এপি সিং একে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে উল্লেখ করেন।

ভারত এখন আরও এস-৪০০ কেনার পরিকল্পনা করছে। রাশিয়া চাইছে ভারত তাদের পঞ্চম প্রজন্মের ‘এসইউ-৫৭’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান কিনুক। পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “এই যুদ্ধবিমানটি বিশ্বের সেরা। আর এটি আলোচনার অংশ হবে।”

যশরাজ শর্মা: একজন স্বাধীন সাংবাদিক। তিনি মানবাধিকার, সমাজ ও প্রযুক্তির সংযোগস্থলে ঘটে চলা বিষয়গুলো নিয়ে লেখালেখি করেন। আল জাজিরার হয়ে তিনি ভারত থেকে সংবাদ প্রতিবেদন করেন।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন