জোর করে বিয়ে, নির্যাতন ও গৃহদাসত্ব: যুক্তরাজ্যে সারা'র বেঁচে ফেরার গল্প
পাকিস্তানে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল সারাকে—এটা তার আসল নাম নয়। বয়স তখন ২১। নতুন জীবন শুরু হবে ভেবে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হতে থাকেন।
সারা বলেন, ‘ও মুখের সামনে লাইটার জ্বালিয়ে ভয় দেখাত, বলত—“পুড়িয়ে ফেলব”।’
২০২২ সালে যখন তাকে যুক্তরাজ্যে আনা হয়, তখন মনে করেছিলেন সব বদলে যাবে। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে না গিয়ে তাকে থাকতে হয়েছিল তার শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে শুরু হয় নতুন নির্যাতন।
স্বামী শুধু গায়ে হাত তোলেননি, সারাকে ‘দাসী’র মতো কাজ করাতেন তার শাশুড়িও। ঘর থেকে বের হতে দিত না। সারাক্ষণ তাকে বলা হতো—‘বাইরে গেলে ধর্ষণের শিকার হবে, মরে যাবে।’
বলা হতো, ‘কাজে যেতে পারবে না, শুধু বাসায় থাকবে।’
সারা বলেন, ‘একসময় মনে হতো আমি যেন বন্দি হয়ে গেছি। কেউ আমাকে দেখতে পায় না, জানে না আমি কোথায়।’
স্বামী তখন প্রায়ই তার গায়ে জিনিস ছুঁড়ে মারতেন, ধাক্কা দিতেন, লাথিও মারতেন। একদিন সারা জানতে চেয়েছিলেন, তার ফোনের ওয়াইফাই বন্ধ কেন।
প্রতিউত্তরে স্বামী ক্ষিপ্ত হয়ে রিমোট ও চাবি তার মুখে ছুঁড়ে মারেন। গলা চেপে ধরেন, মাথায় তিন-চারবার আঘাত করেন।
সারা বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি মরে যাচ্ছি।’
সে রাতে স্বামী দরজার কাছে শুয়ে ছিল, যাতে সে বাইরে যেতে না পারে।
পরদিন ভোরে—একটা পুরো রাত কেঁদে আর ভাবার পর সারা পুলিশের কাছে ফোন করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কীভাবে করলাম, কিন্তু সকালে ছয়টায় ফোন করেছিলাম।’
পাঁচ মিনিট পর পুলিশ আসে। সারা তখন নিজের ঘরে এক কোণে কুঁকড়ে ছিলেন।
এক পুলিশ সদস্য ওপরে এসে তাকে দেখে বুঝতে পারেন, সে ভয় পেয়েছে। শরীর কাঁপছিল, ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল, রক্তচাপ ছিল খুব কম।
২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে লিডসে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হলেও, সারার অনুরোধে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। কারণ, সারা ভয় পাচ্ছিল, পাকিস্তানে থাকা তার পরিবারের ক্ষতি হতে পারে।
অবশেষে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সারা স্বামীকে তালাক দেন।
তিনি জানান, পাকিস্তানে ফিরতে চান না। কারণ, তালাকপ্রাপ্ত নারীদের সেখানে ‘লজ্জার বিষয়’ হিসেবে দেখা হয়। পরিবার থেকেও আবার জোর করে বিয়ে দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তার।
সারার ভাষায়, ‘পরিবারের অনেকে ভাবে, আবার ওকে কোনোভাবে বিয়ে দিয়ে দিলেই হলো।’
এখন তিনি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন। ডার্বিশায়ারে বসবাস করছেন, ইংরেজি শিখছেন, ধীরে ধীরে নিজের জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
সারা আহ্বান জানান, কেউ যেন কাউকে জোর করে বিয়ে না দেয়।
তার মতে, ‘জোর করে বিয়ে মানে কারও জীবন শেষ করে দেওয়া। শুধু মেয়েদের না, ছেলেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগে ভাবুন, বুঝুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।’
এই অভিজ্ঞতা শুধু সারার নয়—যুক্তরাজ্যে এমন বহু মানুষ জোর করে বিয়ের শিকার হন।
তবে এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই, ঠিক কতজন এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন।
এই বাস্তবতা পাল্টাতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর একটি গবেষণা শুরু করেছে—জানার জন্য, এই সমস্যার পরিসর কতটা।
নটিংহ্যাম ও বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সহায়তায় তৈরি হচ্ছে একটি তথ্যভিত্তিক গল্প।
ড. হেলেন ম্যাককেব নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। বলেন, ‘সরকারকে আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম, নতুন তথ্য দরকার। এটা হবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে এই বিষয়ে প্রথম বড় গবেষণা।’
তার ভাষায়, ‘যতক্ষণ না আমরা জানি কতজন মানুষ এতে আক্রান্ত, ততক্ষণ সঠিক নীতিমালা তৈরি করা সম্ভব নয়।’
এই গবেষণা মার্চ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এর ফলাফলের ভিত্তিতে সরকার বুঝতে পারবে, কতটা সহায়তা প্রয়োজন এবং কীভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করা যায়।
সুরক্ষা ও নারী-সহিংসতা বিষয়ক মন্ত্রী জেস ফিলিপস বলেন, ‘এই সরকার আইন ও অন্যান্য উপায়ে জোর করে বিয়ে ও নির্যাতন বন্ধে কাজ করছে। যারা এসব অপরাধ করে, তাদের জন্য আমার বার্তা—আমরা তোমাদের বিচারের মুখোমুখি করব।’

