Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

পশ্চিমা শান্তি উদ্যোগ: সত্য না মরীচিকা?

Icon

পুহিজা শেমসেদিনি

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৫৬ পিএম

পশ্চিমা শান্তি উদ্যোগ: সত্য না মরীচিকা?

‘গার্লহুড অ্যাট ওয়ার’ বইতে কসোভোর ১৯৯৮-৯৯ সালের যুদ্ধকে এক শিশুর চোখে তুলে ধরেছেন রাজনীতি-বিশারদ ভিওসা মুসলিউ। তখন তার বয়স মাত্র ১২। যুদ্ধের পরপরই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সার্ব ও আলবেনীয়দের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে নানা ওয়ার্কশপ আয়োজন করে।

বইয়ের শেষ অধ্যায় ‘লিটল রেড রাইডিং হুড’-এ মুসলিউ বর্ণনা করেন, কিশোরী অবস্থায় ২০০২ সালে অংশ নেওয়া একটি শান্তি কর্মশালার কথা। সেখানে বিদেশি প্রশিক্ষকেরা ‘লিটল রেড রাইডিং হুড’ গল্পটি নেকড়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে বলেন। নতুন গল্পে, বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় বহুদিন না খেয়ে থাকা নেকড়ে ক্ষুধায় পাগল হয়ে ওঠে। তাই সে মেয়েটি ও তার দাদিকে খেয়ে ফেলে।

এই গল্পে অংশগ্রহণকারীরা যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। একদিকে নেকড়ের ক্ষুধা কি ন্যায্যতা দিতে পারে হত্যার? আর অন্যদিকে, এমন একটি গল্প কীভাবে শান্তি আলোচনার কৌশল হতে পারে? প্রশিক্ষকেরা ব্যাখ্যা দেন—প্রত্যেক গল্পেরই একাধিক দিক আছে, সত্য মাঝখানে কোথাও থাকে।

বিশ বছর পর, সেই অভিজ্ঞতা যেন আবার ফিরে পেলাম। সম্প্রতি আমি এক কর্মশালায় অংশ নিই, যেখানে কসোভো ও সার্বিয়ার তরুণীদের নিয়ে ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা শান্তি ও সংলাপ বিষয়ক প্রশিক্ষণ আয়োজন করে। প্রশিক্ষক ছিলেন বিদেশি, তবে এবার দুজন সহকারীও ছিলেন—একজন কসোভো থেকে, অন্যজন সার্বিয়া থেকে। তারা যেন মুখস্থ চিত্রনাট্য অনুসরণ করছিলেন।

প্রথম দিন আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়, শান্তিকে আমরা কীভাবে বুঝি। তখন আমরা আমাদের গল্প বলি, যেগুলোর অনেকটাই যন্ত্রণাদায়ক। কিছু কথা এখনো কানে বাজে। কিন্তু প্রশিক্ষকের যেন মূল চিন্তা ছিল আমরা ১৫ মিনিট দেরি করেছি, গল্পের গভীরতা নিয়ে নয়।

দ্বিতীয় দিন শেখানো হয় ‘ইন্টিগ্রেটিভ নেগোশিয়েশন’। উপস্থাপনায় লেখা ছিল—‘মানুষকে সমস্যা থেকে আলাদা করতে হবে’। এই বাক্য পড়ে থমকে গেলাম। যারা আমার পরিবারকে গৃহহীন করল, যাদের ভয়ে মা-বাবাকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল, যারা আমার মায়ের বিয়ের শাড়ি ছিঁড়ে ফেলেছিল, সেই মানুষগুলোকে আর সমস্যাগুলোকে কি আলাদা করা যায়?

অন্য জায়গায় ঘটনা আরও ভয়াবহ। ৮ হাজারের বেশি আলবেনীয় নাগরিক হত্যা বা গুম হয়েছিল। ধর্ষণের শিকার হয়েছিল অন্তত ২০ হাজার নারী, পুরুষ, কিশোর ও শিশু।

একজন বেঁচে যাওয়া নারী বলেন, ‘তখন আমার বয়স ১১। নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তারা আমার শরীরে ছুরি দিয়ে চিহ্ন কেটে বলেছিল—এই স্মৃতি মনে রেখো।’

তখন ভাবি, যারা এসব দেখেনি, তাদের কাছে হয়তো এই কষ্টের গভীরতা পৌঁছায় না। ওয়ার্কশপ শেষে তারা বিমান ধরে ফিরে যায়। কিন্তু আমরা পড়ে থাকি—একটা অসমাপ্ত যুদ্ধ আর ক্ষতের ভিতরে।

বসার জায়গাগুলো মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন আমরা বন্ধু হই। কিন্তু দুপুরের খাবারে এসে দেখি সার্ব আর আলবেনীয় মেয়েরা আলাদা টেবিলে বসেছে। আয়োজকেরা যখন এই বিভাজনের কারণ জিজ্ঞেস করে, বললাম—‘আপনারা যুদ্ধের কথাই বলেননি এখনো। শান্তির গল্প কিসের ভিত্তিতে গড়বেন?’

আমি একবার যৌন সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলতে চেয়েছিলাম। তখন বলা হলো—‘তুমি এখনো প্রস্তুত নও।’ এই বাক্য যেন পশ্চিমা আধিপত্যের গলা—তুমি এখনো গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নও, ইতিহাস বুঝবার মতো ‘পরিপক্ব’ নও।

পঞ্চম দিনে বলা হলো, ‘ভিন্ন ভিন্ন সত্য আছে। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও আছে।’

আমি চুপ করে বসে রইলাম। ২৬ বছর পর আমার কানে বাজল এক ভয়াবহ বার্তা—‘সত্য অনেক রকম হয়।’

ভাবি, আগামী কিছু বছর পর যদি কেউ গাজার শিশুদের সামনে গিয়ে বলে—‘তোমাদের গল্পেও তো অনেক দৃষ্টিভঙ্গি আছে’, তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে একজন ফিলিস্তিনি কী বলবে?

সত্য কখনো আপোষে হয় না। তা প্রমাণে দাঁড়িয়ে থাকে। এবং কিছু সত্য এমনই, যাদের সামনে কোনো গল্প চলতে পারে না।

পুহিজা শেমসেদিনি: পুহিজা শেমসেদিনি সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষার্থী। তার গবেষণার মূল বিষয় আন্তর্জাতিক আইন, লিঙ্গ ও নিরাপত্তা, সংঘাত এবং উত্তরণকালীন বিচারব্যবস্থা।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন