হংকংয়ে অগ্নিকাণ্ডে ৯৪ জনের মৃত্যু, দায়ী অনিরাপদ মাচা ও ফোম: পুলিশ
হংকংয়ের তাই পো জেলার ওয়াং ফুক কোর্ট আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯৪ জন মারা গেছেন এবং বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবন সংস্কারের কাজে ব্যবহৃত অনিরাপদ বাঁশের মাচা ও দাহ্য ফোম জাতীয় উপকরণ আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
আগুন লাগার পর থেকে দমকল বাহিনী চেষ্টা করে যাচ্ছে উঁচু তলায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে। আগুন ও ধোঁয়ার তীব্রতায় কাজ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক ব্যক্তিকে ১৬ তলার সিঁড়ি থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
শুক্রবার সকালের মধ্যে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৪ জনে। আহত হয়েছেন অন্তত ৭৬ জন, যার মধ্যে ১১ জন দমকলকর্মী। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি হংকংয়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড।
আটটি ভবনের মধ্যে চারটিতে আগুন নিভে গেছে এবং তিনটিতে নিয়ন্ত্রণে আছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। একটি ভবন আগুনের বাইরে রয়েছে।
হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে ২৭৯ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে পরে কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেছে। ৯০০-এর বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে।
পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট আইলিন চুং বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা চরম অবহেলা করেছেন। যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ভয়াবহ প্রাণহানি হয়েছে।’
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক ও এক প্রকৌশলী পরামর্শককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে পুলিশ ‘প্রেস্টিজ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’র দপ্তরে অভিযান চালায় এবং বেশ কিছু নথি জব্দ করে। সরকারও এই প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের নিবন্ধিত ঠিকাদার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তারা জানিয়েছে, মাচার ওপর অগ্নিরোধক জাল ও পর্দা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কেউ নিয়ম ভেঙে থাকলে ভবন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পাঠানো হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বলা হচ্ছে, মাচায় ব্যবহৃত জাল ও প্লাস্টিক দাহ্য ছিল। একটি ভবনের জানালায় ফোমজাতীয় পদার্থও পাওয়া গেছে, যেটি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান লাগিয়েছিল।
বাঁশের মাচা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও ধীরে ধীরে বাঁশের ব্যবহার কমিয়ে ফেলার কথা বলা হচ্ছে, তবে এখনো অনেক প্রকল্পে এটি প্রচলিত।
ঘটনাটিকে অনেকেই ২০১৭ সালের লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ার দুর্ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে ৭২ জন প্রাণ হারিয়েছিল।
স্থানীয় হলগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেগুলোর একাধিক ইতোমধ্যেই পরিপূর্ণ। নির্বাচন উপলক্ষে কয়েকটি অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
বুধবার রাতে অনেক হতভম্ব বাসিন্দাকে কাঁদতে দেখা গেছে। কেউ স্ত্রীকে হারিয়েছেন, কেউ এখনও বন্ধুর খোঁজে।
৭১ বছর বয়সী একজন বাসিন্দা বলেন, তার স্ত্রী এখনো ভবনের ভেতরে আটকে আছেন। আরেক নারী বাসিন্দা চু বলেন, এখনো তার বন্ধুরা নিখোঁজ। তিনি কিছুই করতে পারছেন না।
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই ভবনে বসবাসরত হ্যারি চ্যাং বলেন, বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে এক বিকট শব্দ শোনেন এবং আগুন দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না এখন কেমন অনুভব করছি। ভাবছি কোথায় ঘুমাবো, কারণ আমার বাসায় আর ফেরা যাবে না।’
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগুন নিভিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ‘সর্বাত্মক প্রচেষ্টা’ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সংস্কারকাজ চলাকালে মাচার ওপর কয়েকজন শ্রমিক ধূমপান করছিলেন।
হংকংয়ে ভবন নিরাপত্তার মান উন্নত হলেও স্ক্যাফোল্ডিং বা মাচা ঘিরে আগুনের ঘটনা নিয়ে স্থানীয় একটি সংগঠন উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, চলতি বছরেই অন্তত তিনবার বাঁশের মাচায় আগুন লেগেছে।
ওয়াং ফুক কোর্ট একটি সরকারি ভর্তুকিভিত্তিক হাউজিং প্রকল্প। এখানে প্রায় ২,০০০ ফ্ল্যাট রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪,৮০০ মানুষ থাকেন।
কমপ্লেক্সটি ১৯৮৩ সাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি এখানে সংস্কার কাজ চলছিল।

