Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

মার্কিন-ইসরায়েলি ‘শান্তি পরিকল্পনা’ কীভাবে গাজাকে ভাগ করে ফেলবে

Icon

জনাথন হুইটল

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ১২:১৬ পিএম

মার্কিন-ইসরায়েলি ‘শান্তি পরিকল্পনা’ কীভাবে গাজাকে ভাগ করে ফেলবে

গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর, গাজা এক অদৃশ্য বিভাজনে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে ‘সবুজ এলাকা’, যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। আর অন্যদিকে ‘লাল এলাকা’, যেখানে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে রাখা হয়েছে। এই দুই অঞ্চলকে আলাদা করেছে ‘হলুদ রেখা’—যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছিল, গাজার পুনর্গঠন কেবল ‘সবুজ এলাকা’তেই সীমিত থাকবে। এই এলাকায় ইসরায়েল ও তার মিত্ররা ‘বিকল্প নিরাপদ বসতি’ তৈরির পরিকল্পনা করছে।

যদিও কিছু সূত্র বলছে, এই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে, তবু মানবিক সহায়তা খাতে কাজ করা অনেকে জানাচ্ছেন—রাফাহ শহরে প্রথম এই ধরনের একটি বসতি তৈরি হচ্ছে। এরপরে হলুদ রেখা ধরে আরও ১০টি বসতি গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই ‘নিরাপদ বসতিগুলো’ বাস্তবায়িত হলে গাজার এক বিপজ্জনক বিভাজন চূড়ান্ত রূপ পাবে। এসব বসতির উদ্দেশ্য কোনো মানবিক সহায়তা নয়। বরং এগুলো এমন অঞ্চল হবে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে ঢুকতে দেওয়া হবে, যাতে তারা সীমিত সেবা পায়। তবে তাদের ‘লাল এলাকা’তে ফিরতে দেওয়া হবে না, যা অবরুদ্ধ ও নিষিদ্ধ অঞ্চল হিসেবে থেকে যাবে।

ইসরায়েলের বহু পুরোনো পরিকল্পনারই এক নতুন সংস্করণ যেন এটি। আমি যখন জাতিসংঘে কাজ করতাম, তখনই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রথম ‘বাবল’ বা বুদবুদের মতো অঞ্চল তৈরির ধারণা দিয়েছিল—যেখানে ফিলিস্তিনিদের আলাদা করে রাখা হবে এবং শর্তসাপেক্ষে সামান্য সাহায্য দেওয়া হবে।

এই হলো গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ নামে বাস্তবতা। এটা শান্তি নয়, বরং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে আরও টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। বরং বলা যায়, এটি ‘গাজা টুকরো পরিকল্পনা’।

সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যাতে গাজা পরিচালনার জন্য একটি ‘শান্তি বোর্ড’ এবং নিরাপত্তা রক্ষায় একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী (আইএসএফ) গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে এই বাহিনী আসলে কাদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? কোনো পারস্পরিক চুক্তি ছাড়া এই বাহিনী কী রক্ষা করবে?

আমি যে মানচিত্র দেখেছি, সেখানে দেখা গেছে—আইএসএফ থাকবে হলুদ রেখার আশপাশে এবং নতুন তৈরি হওয়া বসতিগুলোই তারা রক্ষা করবে।

হামাস জাতিসংঘের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যা অনুমিতই ছিল। কারণ, এটি কোনো সমঝোতার ফল নয়। ট্রাম্প পরিকল্পনার ২০টি দিকনির্দেশনার মধ্যে ১৭ নম্বরে বলা আছে—হামাস যদি বিলম্ব করে বা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ‘সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চল’-এ সব কার্যক্রম চালু রাখা হবে।

ফলে এই ‘নিরাপদ বিকল্প বসতি’-ই হয়ে উঠতে পারে সাহায্য পাওয়ার একমাত্র কেন্দ্র। অন্যদিকে ‘লাল এলাকা’তে থাকা মানুষদের একঘরে করে রাখবে এই পরিকল্পনা।

গত দুই বছরে যারা ঘরছাড়া হয়েছে, এই পরিকল্পনা সেই বাস্তবতাকে বৈধতা দিচ্ছে। ‘লাল এলাকা’তে যারা রয়ে গেছে, তাদের ‘হামাস সমর্থক’ বলে চিহ্নিত করা হতে পারে। এমনটা হলে, তারা কোনো আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাবে না এবং সেনা অভিযানের ঝুঁকিতে থাকবেই।

‘লাল এলাকা’র মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সরকারি পরিকল্পনায় কিছু বলা হয়নি। বরং জীবন রক্ষাকারী মানবিক সংস্থাগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে এমন এক নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা মূলত সমালোচনাকে রোধ করতেই তৈরি।

এ ধরনের পরিকল্পনা নতুন নয়। মালয়ায় ব্রিটিশরা ‘নতুন গ্রাম’, ভিয়েতনামে আমেরিকানরা ‘কৌশলগত গ্রাম’, রোডেশিয়ায় (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) উপনিবেশবাদীরা ‘নিরাপদ গ্রাম’ করেছিল। সবখানেই লক্ষ্য ছিল—জনগণকে বাধ্য করে শিবিরে রেখে, তাদের মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করা।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ সরকার ‘বান্তুস্থান’ তৈরি করেছিল, যেগুলো ছিল কেবল নিয়ন্ত্রণের কৌশল। এসব কোথাও সফল হয়নি।

গাজায় যেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটি কোনো সমঝোতার ভিত্তিতে নয়—বরং চাপিয়ে দেওয়া এক পরিকল্পনা। এতে দখলদারিত্ব কেবল টিকে থাকছে না, বরং আরও শক্তিশালী হচ্ছে। জাতিসংঘ যে প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, তা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়কেও উপেক্ষা করছে।

সবকিছু ঘটছে এক তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যে—যেখানে ফিলিস্তিনিরা এখনো নিহত হচ্ছে, এমন কিছু সীমারেখা অতিক্রম করার কারণে, যা আইনবহির্ভূতভাবে তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব হয়তো এই পর্যায়কে যুদ্ধের ইতি বলে দেখছে। অনেকে হয়তো খুশি—ইসরায়েলকে আবার বাণিজ্য করতে দেওয়া যাবে, আর জনমতের চাপে পড়তে হবে না।

কিন্তু সত্যিকারের শান্তির পথ একটাই—জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় কার্যকর করা। ফিলিস্তিনিরা যেখানে আছে, সেখানে যেন বাধাহীনভাবে সাহায্য পৌঁছায়। আর নিজেদের ঘরবাড়ি গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিক তারাই, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই জমির মালিক।

গাজায় যা ঘটছে, তা শুধু গাজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটা পুরো বিশ্বব্যবস্থার নিয়মের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। এখন সময় এসেছে সেই নীতিতে ফিরে যাওয়ার—যেখানে একটি জাতির নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার স্বীকৃত।

জনাথন হুইটল একজন দক্ষিণ আফ্রিকান মানবিক সহায়ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি ১৪ বছর কাজ করেছেন ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ (এমএসএফ)-এ। বর্তমানে তিনি বৈরুতে অবস্থিত ‘কিজ ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি রাজনৈতিক পরামর্শ ও কৌশলগত বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন