শান্তি না আত্মসমর্পণ? ট্রাম্পের প্রস্তাব ঘিরে ইউক্রেনে উত্তেজনা
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তি নিয়ে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তবে এই পরিকল্পনায় ইউক্রেনকে ‘কষ্টকর ছাড়’ দিতে হতে পারে—যা রুশ আগ্রাসন থামাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার জেলেনস্কির কার্যালয় জানায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ওই খসড়া শান্তিচুক্তির একটি কপি পেয়েছেন। তিনি শিগগিরই ট্রাম্পের সঙ্গে শান্তির সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক পথ নিয়ে আলোচনা করবেন।
জেলেনস্কি রাতে দেওয়া ভিডিও বার্তায় বলেন, ইউক্রেন কোনোভাবেই কূটনৈতিক চেষ্টাকে ব্যাহত করবে না। তার ভাষায়, ‘আমাদের শান্তি দরকার। আমরা এমন কিছু করব না যাতে কেউ বলতে পারে, আমরা শান্তির পথ রুদ্ধ করছি।’
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের সঙ্গে গঠনমূলক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
তবে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় যে যত্নশীল ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, ইউক্রেনের অনেক কর্মকর্তাই সেই প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ দফার প্রস্তাবটি ২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর মস্কো যে দাবি তুলেছিল, তার সঙ্গে মিল রয়েছে। এটি তৈরি হয়েছে রুশ ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা থেকে, যেখানে কিয়েভের মত নেওয়া হয়নি। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক জানান, তারা এই পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে দেখে প্রথম জানতে পারেন।
এই পরিকল্পনায় ইউক্রেনকে ক্রিমিয়া ও দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। খেরসন ও জাপোরিঝিয়ার বর্তমান যুদ্ধরেখা ‘স্থায়ীভাবে’ স্থির করে দিতে বলা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কমিয়ে ছয় লাখে আনার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া ইউক্রেনকে জানানো হয়েছে, তারা কখনোই ন্যাটোর সদস্য হতে পারবে না। ইউরোপের যোদ্ধা বিমানগুলো পোল্যান্ডে অবস্থান করবে, তবে ইউক্রেনে কোনো বিদেশি সেনা থাকবে না। অর্থাৎ, যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স নেতৃত্বাধীন কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনীও সেখানে যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র অজ্ঞাত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে এবং রাশিয়ার জব্দকৃত ১০০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ইউক্রেন পুনর্গঠন করা হবে। ভবিষ্যতে রাশিয়াকে আবারও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার পথও খোলা রাখা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার খসড়া দেখে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলেন, এটি কার্যত তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব শেষ করে দেওয়ার সমান। প্রায় চার বছর আগে রাশিয়া কিয়েভ দখলের চেষ্টা করেছিল। সেই ব্যর্থতার পর এখন এমন পরিকল্পনা এসেছে।
বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি মার্কিন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি ড্যান ড্রিসকোলের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পুরোনো সহপাঠী। ড্রিসকোল কিয়েভে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে এসেছেন এবং আগামী সপ্তাহে মস্কো যাওয়ার পরিকল্পনা আছে বলেও মার্কিন সূত্র জানায়।
মার্কিন কূটনীতিকরা জানান, ট্রাম্প ‘জোরালো কূটনৈতিক গতি’ নিয়ে শান্তিচুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যেই একটি সমঝোতা চায়।
জেলেনস্কি ও ড্রিসকোল এক ঘণ্টা একান্ত বৈঠক করেন। এরপর ইউক্রেনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জুলি ডেভিস বলেন, ‘আজ আমরা দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতার সাক্ষী হলাম। আমরা এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’
তবে ইউক্রেনের অনেকে বলছেন, এই প্রস্তাব একপ্রকার উসকানি, যার উদ্দেশ্য বিভাজন সৃষ্টি ও মিত্রদের দিশেহারা করা।
তাদের ভাষায়, পুতিন সময় নষ্ট করছেন, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চাইছেন। ইউক্রেনের সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান ওলেক্সান্দ্র মেরেজকো বলেন, ‘এটি একপ্রকার আত্মসমর্পণ—ইউক্রেনের, ইউরোপের এবং আমেরিকার জন্যও।’
ইউক্রেনের রাজনীতিবিদ রোমান কস্তেঙ্কো বলেন, এই প্রস্তাবে কোনো রকম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। কেবল রাশিয়ার দাবি বাস্তবায়নের রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
ডিপ্লোম্যাটরা বলছেন, এই সময়টিতে জেলেনস্কি দুর্বল, আর রাশিয়া সেই সুযোগ নিচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইউরোপীয় নেতারা বলেছেন, তাদের আগে জানানো হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কাল্লাস বলেন, ‘শান্তি চাইলে ইউক্রেন ও ইউরোপীয়দের মতামত জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া চাইলেই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারত। কিন্তু তাদের কোনো ছাড় দিতে বলা হয়নি।’
গত আগস্টে ট্রাম্প ও পুতিন আলাসকায় সাক্ষাৎ করার পর থেকে শান্তিপ্রচেষ্টা থমকে আছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলশিল্পে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বুধবার টারনোপিলে হামলায় ২৬ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে তিন শিশুও ছিল।

