কপ৩০ সম্মেলন
বেলেমের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ
বেলেম শহরের রাস্তায় শনিবার সকাল থেকে ভেসে আসছিল আদিবাসী স্লোগান, ব্রাজিলের শাস্ত্রীয় গান আর প্রকৃতি-জলবায়ু ন্যায়ের আহ্বান। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল—জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকট মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ চেয়ে।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পরিবেশকর্মীরা এসে হাজির হয়েছিলেন অ্যামাজনের এই শহরে, যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কপ৩০। তারা আলোচকদের প্রতি আহ্বান জানায়—জলবায়ু সংকট নিয়ে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই বর্ণাঢ্য ও প্রতিবাদী পদযাত্রা ছিল ২০২১ সালের গ্লাসগো সম্মেলনের পর সবচেয়ে বড় জলবায়ু আন্দোলন। গত কয়েক বছরের কপ আয়োজন হয়েছে মিসর, দুবাই ও আজারবাইজানে—যেখানে বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই এবার বেলেমের রাস্তায় ফের ফিরে আসে প্রতিবাদের চিত্র।
‘গ্রেট পিপলস মার্চ’ শুরু হয় আলোচনার মাঝপথে। এর আগে সাপ্তাহিক দুটি বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিল টাপাজোস অঞ্চলের আদিবাসীরা।

রাকেল ওয়াপিচানা নামে এক আদিবাসী নারী, মাথায় ফুলের মালা পরে, হাতে একটি সাইন ধরে রেখেছিলেন—‘ভামোস আ লুতা!’ অর্থাৎ ‘আমরা লড়ব’। তিনি রোরাইমা রাজ্য থেকে নয় ঘণ্টা ভ্রমণ করে এসেছেন। বলেন, ‘আমি এসেছি আমার জাতির জন্য, আমার ভূমির জন্য, আমাদের নদী আর পূর্বপুরুষদের জন্য। আমরা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে—খনি, কৃষি ব্যবসা আর ভূমি দখলের কারণে। আমাদের বাঁচতে হলে লড়তেই হবে।’
মিছিলে ছিল আরও এক ব্যতিক্রমী আয়োজন—‘জ্বালানি তেলের শেষকৃত্য’। সেখানে কালো পোশাকে বারোজন মানুষ বিশাল তিনটি কফিন ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। কফিনগুলোর গায়ে লেখা ছিল—‘কয়লা’, ‘তেল’, ‘গ্যাস’। দুইটি বড় ভূতের পুতুলও ছিল মিছিলে।
ক্রিশনা নামে একজন, যিনি নিজেকে বেলেমের একজন অভিনেত্রী বলে পরিচয় দেন, পরেছিলেন কালো লেসের ঘোমটা আর হাতে ছিল ছাতা। বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর। আমি আমার শিল্প দিয়ে লড়াই করছি।’
মিছিলে বড় একটি ব্যানারে লেখা ছিল—‘পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে দায়ী পুঁজিবাদ। লুলা, অ্যামাজনে তেল নিয়ে তথাকথিত জ্বালানি রূপান্তর একটা প্রহসন।’ এর পাশেই বাজছিল ইতালির সমাজতান্ত্রিক গান ‘বেলা চাও’। এখানে উপস্থিত ছিলেন মারিয়া মেলিয়া, মারানহাও রাজ্যের কিলম্বোলা আন্দোলনের প্রতিনিধি। তিনি বলেন, ‘আমরা অ্যামাজন রক্ষা করতে এসেছি। “হাইড্রোভিয়া” নামের পানিপথ প্রকল্প আমাদের এলাকা ধ্বংস করছে।’
অনেকেই বড় করে তৈরি করা প্রাণীর ছবি নিয়ে মিছিলে অংশ নেন। কেউ কেউ ক্যাপিবারার (একধরনের বিশাল আকৃতির জলচর প্রাণী) ছবি উঁচিয়ে ধরেন। তাদের মধ্যে একজন ফ্যাব্রিসিও। বলেন, ‘প্রাণীরাও সুরক্ষা পাওয়ার দাবিদার। আলোচকরা যেন জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন।’

মিছিলে ফিলিস্তিনের পক্ষে সহানুভূতির প্রকাশ ছিল। ব্রাজিলের জনপ্রিয় গান ‘আনুনসিয়াসাও’ বাজছিল বিভিন্ন স্পিকারে।
মিছিলে একটি বিশালাকৃতির (৩০ মিটার লম্বা) সাপও নিয়ে আসা হয়। প্রান্তে থাকা ৮০ জন কর্মী সেটি ধরে রেখেছিলেন। এই সাপ দুই অর্থে ব্যবহার হয়েছে: এটি আদিবাসীদের কাছে পবিত্র প্রাণী।
হেলেনা রামোস, অ্যামাজোনিয়া দা পে নামের একটি গ্রাসরুট সংগঠনের কর্মী। বলেন, ‘আমরা এসেছি অ্যামাজনের মানুষদের জন্য জলবায়ু অর্থায়নের দাবি নিয়ে।’
এই সাপের আইডিয়াটি আসে এক আদিবাসী নেতার স্বপ্ন থেকে। পরে ১৬ জন শিল্পী সান্তারেম শহরে এটি তৈরি করেন। অ্যামাজনের তরুণদের একটি দল এটি নৌকায় করে নিয়ে আসে। রামোস বলেন, ‘এটা খুব ভারী না। এটা আমাদের দায়িত্ব, আমাদের সংগ্রামের অংশ।’
মিছিলে অনেকেই জলবায়ু সংকট নিয়ে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপের আহ্বান জানান। এখনও এক সপ্তাহ বাকি সম্মেলন শেষ হতে। তবে আলোচনার ফল কী হবে, তা নিশ্চিত নয়।
ব্রাজিলের আয়োজকেরা বলেছেন, তারা ‘কভার ডিসিশন’ বা চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন না। বরং বাস্তবায়নের দিকেই মনোযোগ দেবেন। তবে এই বাস্তবায়ন কেমন হবে, তা এখনো পরিষ্কার না।
এদিকে আলোচনার মূল চারটি বিষয়ে এখনও অচলাবস্থা রয়ে গেছে—জলবায়ু অর্থায়ন, বাণিজ্য, স্বচ্ছতা এবং দেশগুলোর ন্যাশনাল ক্লাইমেট প্ল্যান কতটা দুর্বল—তা মোকাবিলা করার কৌশল। এ নিয়ে আলাদা আলোচনায় যাচ্ছে আয়োজক পক্ষ।

