Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

জলবায়ু লড়াইয়ে আসিয়ানেরই এগিয়ে থাকা জরুরি

Icon

নিক নজমি নিক আহমাদ

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০২:১০ পিএম

জলবায়ু লড়াইয়ে আসিয়ানেরই এগিয়ে থাকা জরুরি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আরও সন্দেহপ্রবণ ও বৈরী মনোভাব নিলেও জলবায়ু সংকট যে বাস্তব, সেই সত্য একটুও বদলায় না।

তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে গ্লোবাল সাউথ, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে গঠিত আসিয়ান, যার সদস্যসংখ্যা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন। এদের প্রায় সব দেশই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে।

সম্প্রতি টাইফুন টিনো ও উয়ানের আঘাতে ফিলিপাইনসহ আশপাশের অঞ্চল যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা আবারও মনে করিয়ে দেয় জলবায়ু ন্যায়ের প্রয়োজন কতটা জরুরি।

জলবায়ু সম্মেলন যেমন কোপ৩০ থেকে গ্লোবাল সাউথ কী চায়, সেটা বহুবার বলা হয়েছে। বিষয়টা চারটি মূল চাহিদায় গিয়ে ঠেকে।

প্রথমত, উন্নত দেশগুলোর উচিত মনোযোগ দিয়ে শোনা।

গ্লোবাল সাউথ কীভাবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে চায়, সেই কণ্ঠস্বর শোনা জরুরি। কঠোর, একপেশে নীতিতে প্রযুক্তি, শক্তি রূপান্তর কিংবা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পথ চললে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো যেমন মালয়েশিয়া বা অন্য আসিয়ান সদস্যরা যা ইতিবাচক চেষ্টা করছে, তা ব্যাহত হবে।

উন্নত দেশগুলোর আরও নমনীয় হলে পুরো পৃথিবীর জলবায়ু আন্দোলন এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে।

এটা কোনো ছাড় বা আত্মরক্ষার কথা নয়। টেকসই পরিবেশে বাঁচার অধিকার এখন একটি মৌলিক মানবাধিকারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

গাজার ধ্বংসযজ্ঞে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সারা বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। অথচ পশ্চিমা দেশগুলো অনেকটা নীরব।

এই কারণে পরিবেশ ও মানবাধিকারকে একে অপরের পরিপূরক ভাবা জরুরি। আসিয়ান ও গ্লোবাল সাউথে টেকসই উদ্যোগ মানেই মানুষের অধিকার রক্ষা করা।

দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশগুলোর টাকার থলি নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত।

স্পষ্ট করে বললে, অর্থ কথা বলে। জলবায়ু অর্থায়নের যে প্রতিশ্রুতি উন্নত দেশগুলো দিয়েছে, তা শুধু পূরণ করলেই চলবে না—তা আরও বাড়াতে হবে।

জাতিসংঘের বৈশ্বিক নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন হবে প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে সেটা বেড়ে দাঁড়াবে ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।

কোপ৩০-এর আয়োজক ব্রাজিলও বলেছে, তারা চায় এই সম্মেলন ‘অ্যাডাপটেশন ইমপ্লিমেন্টেশনের’ জায়গা হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হোক। কারণ এখন সময় শুধু লক্ষ্য ঠিক করার নয়, বাস্তবায়নের।

তৃতীয়ত, গ্লোবাল সাউথ নিজের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে।

সত্যি কথা বলতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি—যে দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি—একটা বড় ছায়া ফেলছে জলবায়ু সম্মেলনে। তবে সেটাকে ভয়ের কারণ নয়, বরং বহু-পাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

আমেরিকা পাশে থাকলে ভালো, না থাকলেও বিশ্ব থেমে থাকবে না। যেমন চীনের কার্বন নিঃসরণ গত ১৮ মাসে কমেছে বা স্থির থেকেছে।

এছাড়া ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার প্রস্তাবিত ‘ট্রপিকাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি’ হতে পারে জলবায়ু সমস্যা সমাধানের বড় হাতিয়ার।

বিশ্বব্যাংক এই উদ্যোগের তত্ত্বাবধায়ক। এর মাধ্যমে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সহযোগিতা গড়ে তোলা হচ্ছে। ১২৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে এই প্রকল্পে এরই মধ্যে ৫৩টি দেশ ও ১৯টি স্বতন্ত্র সম্পদ তহবিল যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনসম্পন্ন দেশ রয়েছে, যারা উন্নয়নশীল বিশ্বের ৯০ শতাংশ বন রক্ষা করে।

নরওয়ে, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, পর্তুগাল এবং নেদারল্যান্ডস আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মোট ঘোষিত অর্থ এখন পর্যন্ত ৫.৫ বিলিয়ন ডলার। এটাই শুরু—সামনে আরও পথ বাকি।

এই উদ্যোগ দেখিয়ে দেয় গ্লোবাল সাউথ শুধু দাবি করে না, নিজেরাও নেতৃত্ব দিতে পারে।

উন্নত দেশগুলোর উচিত এই ধরনের উদ্যোগে আন্তরিক সহায়তা করা। কারণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোর বনভূমি পৃথিবীর বড় কার্বন শোষক—এই দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

তবে তা হওয়া উচিত স্বচ্ছ ও ন্যায্য পদ্ধতিতে—না হলে এই দেশগুলোর মানুষের শিক্ষা, চাকরি বা সম্মানকে জলবায়ু রক্ষার মূল্য দিতে হবে।

চতুর্থত, আসিয়ান দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ হিসেবে আসিয়ান অঞ্চলের দায়িত্ব এড়ানো চলবে না।

সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে হওয়া ৪৭তম আসিয়ান সম্মেলনে জলবায়ু ইস্যুটি তেমন গুরুত্ব পায়নি—যা কিছুটা হতাশাজনক। অথচ ২০২৫ সালের সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্যই ছিল ‘অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন’।

তবে সম্মেলনে ‘আসিয়ান যৌথ জলবায়ু বিবৃতি’ গৃহীত হয়েছে এবং কোপ৩০-তে আসিয়ান প্যাভিলিয়ন স্থাপন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ‘আসিয়ান জলবায়ু কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা’ তৈরির দিকেও অগ্রগতি হয়েছে।

এছাড়া সম্মেলনে ‘নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশে থাকার অধিকার’ বিষয়ে আসিয়ান ঘোষণা গ্রহণ করা হয়, যা কয়েক বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল।

এ সময় ঐতিহাসিকভাবে তিমুর-লেস্তে আসিয়ান সদস্য হয় এবং আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড প্রকল্পেও অগ্রগতি দেখা যায়।

তবে এই অর্জনগুলো যতই প্রশংসনীয় হোক, তা এখনও বিশ্ববাসীর কাছে যে প্রত্যাশা গ্লোবাল সাউথ তোলে—সেই তুলনায় অনেকটাই কম।

আমরা চাই অন্যরা কিছু করুক—সেটা ঠিক। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও আরও অনেক কিছু করার আছে।

অনেকে বলবেন আসিয়ানের আর্থিক সক্ষমতা কম। কিন্তু ২০২৫ সালের সম্মেলন দেখিয়েছে, আসিয়ান একটি যোগসূত্রের শক্তিশালী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে—যেখানে চীন, ব্রিকস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গালফ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সেতুবন্ধন সম্ভব।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—আসিয়ান জলবায়ু বিবৃতি কি আন্তঃসরকার জলবায়ু প্যানেলের (আইপিসিসি) সেই সতর্কতা যথাযথভাবে মানে, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে অন্যতম বিপজ্জনক জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বলা হয়েছে?

কথা যতই বলা হোক, কাজ না থাকলে সেগুলো ফাঁকা শোনায়। এতে আসিয়ান—যা দীর্ঘদিন নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছে—এখন সন্দেহের মুখে পড়ে। অনেকে বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প সাময়িকভাবে সম্মেলনে থাকায় তার অবস্থানের প্রতি অনুগত হতেই জলবায়ু বিষয়ে নীরবতা রাখা হয়েছে।

আসিয়ান ও গ্লোবাল সাউথের দরকার সাহসী ও সময়োপযোগী বহু-পাক্ষিক উদ্যোগ, যার সঙ্গে যুক্ত থাকবে অন্য অঞ্চলগুলোও।

ভূরাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য যে তৎপরতা আসিয়ান দেখায়, জলবায়ু ইস্যুতেও সে রকম উচ্চকণ্ঠ নেতৃত্ব প্রয়োজন।

এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। উন্নত এবং উন্নয়নশীল—সব দেশ মিলে একসঙ্গে লড়লে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

নিক নজমি নিক আহমাদ
নিক নজমি নিক আহমাদ একজন মালয়েশীয় রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য। তিনি প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবেশ ও রাজনীতি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি লেখালেখিতেও সক্রিয়। তার রচিত বইয়ের মধ্যে ‘Malaysian Son’ এবং ‘Saving the Planet’ উল্লেখযোগ্য।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন