Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

দিল্লিতে বিস্ফোরণ: ‘সন্ত্রাস’ আইন কেন প্রয়োগ করল পুলিশ

Icon

এলিজাবেথ মেলিমোপোলাস

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫, ০১:৫৩ পিএম

দিল্লিতে বিস্ফোরণ: ‘সন্ত্রাস’ আইন কেন প্রয়োগ করল পুলিশ

নতুন দিল্লিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২০ জনের বেশি। সোমবার রাতে এই বিস্ফোরণের পর ভারতের রাজধানীসহ বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।

কী ঘটেছিল নতুন দিল্লিতে?

সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে, একটি জনবহুল এলাকায় ব্যস্ত সময়ের মধ্যে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে।

দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের উৎস ছিল চলন্ত একটি হুন্ডাই আই২০ গাড়ি।

দিল্লি পুলিশের কমিশনার সতীশ গোলচা জানিয়েছেন, ‘একটি ধীরগতির গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যালে থেমেছিল। সেই গাড়িতে বিস্ফোরণ হয়। এর ফলে আশপাশের গাড়িগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

ঘটনাস্থলের ছবিতে ভাঙা কাঁচ, পুড়ে যাওয়া গাড়ি এবং ধোঁয়া ও আগুনের দৃশ্য দেখা গেছে।

পরবর্তীতে গাড়িটির প্রাথমিক মালিক মোহাম্মদ সালমানকে হরিয়ানার গুরুগ্রামে আটক করা হয়। ২০১৩ সালে সে গাড়িটি কিনেছিল। এরপর সে গাড়িটি দিল্লির একজনকে বিক্রি করে, যিনি আবার সম্প্রতি তা অন্য একজনের কাছে বিক্রি করেন। সালমান যাকে গাড়িটি বিক্রি করেছিলেন, তাকেও আটক করা হয়েছে। যদিও গাড়িটি এখনও সালমানের নামে নিবন্ধিত ছিল এবং হরিয়ানার নম্বর প্লেট লাগানো ছিল।

দিল্লি পুলিশ ‘অবৈধ কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন’ বা ইউএপিএ-র ১৬ ও ১৮ ধারা এবং বিস্ফোরক আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, এখনও বিস্ফোরণের কারণ বা সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ করা না হলেও, প্রশাসন বিষয়টিকে সাধারণ অপরাধ নয়, বরং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে দেখছে।

কোথায় বিস্ফোরণটি ঘটেছিল?

পুরান দিল্লির লাল কেল্লা মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি ব্যস্ত এলাকায় বিস্ফোরণটি ঘটে।

এই স্থানটি লাল কেল্লার প্রবেশপথ এবং চাঁদনি চকের ব্যস্ত বাজারের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিস্ফোরণের অভিঘাত এই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

লাল কেল্লা সম্রাট শাহজাহানের আমলে ১৫৪৬ সালে নির্মিত হয়। এটি ইসলামী, পারসিক, তুর্কি ও হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ সংমিশ্রণ।

এই দুর্গ ভারতের স্বাধীনতার প্রতীকের মতো। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট এখান থেকেই প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দিয়েছিলেন। তখন থেকে প্রতিবছর এখান থেকেই প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

বিস্ফোরণের পেছনে কী প্রেক্ষাপট?

এই বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগে হরিয়ানার ফারিদাবাদ থেকে এক কাশ্মীরি চিকিৎসককে ‘সন্ত্রাসী হামলা পরিকল্পনার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তার বাড়ি থেকে ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক, ২০টি টাইমার, ২৪টি রিমোট কন্ট্রোল, একটি রাইফেল এবং বহু গুলি উদ্ধার করা হয়। তার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে এই ঘটনার সঙ্গে দিল্লির বিস্ফোরণের কোনো সরাসরি যোগসূত্র এখনও সরকারিভাবে নিশ্চিত হয়নি।

ঘটনাস্থলে কী পরিস্থিতি?

দিল্লি শহরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে রেলস্টেশনগুলোতে আগত যানবাহনগুলোতে কড়াভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

মুম্বাই, উত্তরপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন বড় শহরের রেলস্টেশনেও উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি গাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে, পুলিশ এলাকা ঘিরে রেখেছে।

নতুন দিল্লির উপ-দমকল প্রধান জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে ছয়টি গাড়ি ও তিনটি অটোরিকশা দগ্ধ হয়।

এই ঘটনায় একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অপরদিকে বিহারে রাজ্য নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন?

বিস্ফোরণের পর পুরান দিল্লি জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে জানিয়েছেন, তারা বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখেছেন।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী ইরফান বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দ হল। আমরা দৌড়ে এলাম, খুব কাছে যাইনি, ভয় লাগছিল। দেখলাম কারও একটা হাত পড়ে আছে। কেউ একজন সম্পূর্ণভাবে উড়ে গেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কারও ফুসফুস পড়ে থাকতে দেখেছি, গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এই দৃশ্য ভাষায় বোঝানো সম্ভব না।’

আরেকজন, নাজিশ মালিক জানিয়েছেন, তার ভায়রা মোহসিন, যিনি ই-রিকশা চালাতেন, বিস্ফোরণের পর নিখোঁজ হন।

তিনি বলেন, ‘একশর বেশি বার ফোন করার পর অবশেষে একজন ফোন রিসিভ করে বলে, ফোনটা লাল কেল্লা পুলিশ পোস্টে আছে এবং আপনার আত্মীয় লোক নায়ক হাসপাতালে আছেন।’

তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা ৮টা ৩০-এর দিকে আমরা হাসপাতালে যাই, কিন্তু এত নিরাপত্তা ছিল যে আমাদের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’

‘অন্তত জানানো হোক কে আশঙ্কাজনক আর কে মারা গেছে।’

কী ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে বিষয়টি অবহিত করেছেন এবং তিনি নিহতদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং শীর্ষ সংস্থাগুলো তদন্তে নিয়োজিত।

ইসরায়েল ও মিসরের দূতাবাস নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্য একটি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও নিরাপত্তা বার্তা দিয়ে জানায়, ‘আমরা নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।’

দিল্লিতে অতীতে এমন হামলা ঘটেছে?

হ্যাঁ, গত কয়েক দশকে দিল্লিতে একাধিকবার বোমা ও সশস্ত্র হামলা হয়েছে, যদিও গত এক দশকে তেমন কিছু হয়নি।

সেপ্টেম্বর ২০১১: দিল্লি হাইকোর্টের সামনে বোমা বিস্ফোরণে ১৫ জন নিহত। দায় স্বীকার করে হারকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি।

সেপ্টেম্বর ২০০৮: বাজারে পাঁচটি বোমা বিস্ফোরণে ৩৩ জন নিহত। দায় স্বীকার করে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন।

অক্টোবর ২০০৫: তিনটি বিস্ফোরণে ৭০ জন নিহত। দায় স্বীকার করে লস্কর-ই-তৈয়বা।

ডিসেম্বর ২০০১: পার্লামেন্টে জইশ-ই-মোহাম্মদের হামলায় ১৩ জন নিহত।

ডিসেম্বর ২০০০: লাল কেল্লায় হামলায় ৩ জন নিহত।

ভারতের অন্য শহরেও কি এমন হামলা হয়েছে?

হ্যাঁ, বিশেষ করে কাশ্মীরঘেঁষা স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র দলগুলো ভারতের বিভিন্ন শহরে হামলা চালিয়েছে। ভারত বারবার পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দিকে অভিযোগ তুলেছে।

নভেম্বর ২০০৮, মুম্বাই: ১৭০ জন নিহত। দায় স্বীকার লস্কর-ই-তৈয়বা।

জুলাই ২০০৮, আহমেদাবাদ: ১৭টি বিস্ফোরণে ৫৬ জন নিহত।

মে ২০০৮, জয়পুর: ৭০ জন নিহত। দায় স্বীকার ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন।

ফেব্রুয়ারি ২০০৭, হরিয়ানা: সামঝাউতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণে ৭০ জন নিহত।

সেপ্টেম্বর ২০০৬, মালেগাঁও: বিস্ফোরণে ৪৫ জন নিহত।

জুলাই ২০০৬, মুম্বাই: ট্রেনে সিরিজ বোমা বিস্ফোরণে ২০০ জন নিহত।

মার্চ ১৯৯৩, মুম্বাই: একাধিক বিস্ফোরণে ২৫০ জন নিহত।

মে ১৯৯১, শ্রীপেরুমবুদুর: এল.টি.টি.ই. আত্মঘাতী হামলায় রাজীব গান্ধী নিহত হন। প্রাণ হারান আরও ১৫ জন।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন