আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
বেড়েছে ইসলামফোবিয়া, কেমন আছে মার্কিন মুসলমানেরা
এরাম ইকরামুল্লাহ ও পেট্রা আলসুফি
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৫৩ এএম
এই সপ্তাহে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্ট জোহরান মামদানি শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।
তার পথ সহজ ছিল না। প্রাইমারিতে জয় পাওয়ার পর থেকেই তিনি রাজনৈতিকভাবে নানা দিক থেকে আক্রমণের মুখে পড়েন। ডানপন্থী প্রচারক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিত্ব এবং তার তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বী একযোগে তাকে নিশানা করে ঘৃণা ছড়াতে শুরু করেন।
রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া দাবি করেন, মামদানি ‘বিশ্বজুড়ে জিহাদ’ সমর্থন করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিউইয়র্কের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত হন যে মামদানি ‘আরেকটি ৯/১১’ উদযাপন করবেন। বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে কুয়োমোকে সমর্থন দেন, বলেন— মামদানি মেয়র হলে নিউইয়র্ক ইউরোপের মতো হয়ে যাবে, যেখানে ‘ইসলামি চরমপন্থীরা সমাজ ধ্বংস করছে’।
আমরা যারা মুসলিম, এবং যারা ৯/১১–পরবর্তী আমেরিকায় বেড়ে উঠেছি, তারা জানি— ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অযোগ্য প্রমাণের এই ধরনের হামলা নতুন কিছু নয়।
আমাদের গবেষণা বলে, সহিংস কোনো ঘটনার পর নয়— বরং রাজনৈতিক প্রচারণা বা নির্বাচনের সময়েই ইসলামবিদ্বেষ সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায়। ইসলামকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর এতে কিছু প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বাড়ে।
এই প্রবণতা শুধু মামদানির ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের বৃদ্ধির প্রতিফলন। সামাজিক নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ তাদের সাম্প্রতিক জরিপে বলছে— গত তিন বছরে ইসলামফোবিয়া প্রায় সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেড়েছে।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসলামফোবিয়া সূচক ছিল ২৫। ২০২৫ সালে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩। শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিকালদের মধ্যে এই স্কোর ৩০ থেকে বেড়ে ৪৫ হয়েছে। ক্যাথলিকদের মধ্যে ২৮ থেকে ৪০ এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ২৩ থেকে ৩০ হয়েছে। ইহুদিদের মধ্যে এই স্কোর ১৭ থেকে ১৯ হয়েছে, যা ২০২৫ সালে মুসলিমদের স্কোরের সমান।
এই বেড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ভাষণে ইসলামবিদ্বেষের অপব্যবহার। এর ফলে মুসলিমরা চাকরি হারাচ্ছে, ধর্মীয় উপাসনায় বাধা পাচ্ছে, স্কুলে শিশুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, এমনকি শারীরিক আক্রমণেরও মুখে পড়ছে।
আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলামবিদ্বেষ মূলত পাঁচটি ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো— মুসলিমরা সহিংসতা সমর্থন করে, নারীদের বৈষম্য করে, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব পোষণ করে, অসভ্য বা কম উন্নত, এবং অন্যত্র সংঘটিত সহিংসতায় পরোক্ষভাবে জড়িত।
কিন্তু প্রকৃত তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। আমেরিকান মুসলিমরা সাধারণ জনগণের তুলনায় সহিংসতার বিরুদ্ধে বেশি সোচ্চার। তারা সেনাবাহিনীর সাধারণ মানুষের ওপর হামলাকেও নিন্দা জানায়। মুসলিম নারীরা জোর করে নয়, বিশ্বাস থেকে হিজাব পরেন— এবং তাদের ধর্ম তাদের জন্য গর্বের ও আনন্দের উৎস।
এমনকি যারা ধর্মীয়ভাবে যতটা অঙ্গীকারবদ্ধ, তারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশি আনুগত্য দেখায়। মুসলিমরা সক্রিয়ভাবে নাগরিক দায়িত্ব পালন করে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমাজ গঠনে কাজ করে এবং সংকটকালে সাহায্যে এগিয়ে আসে।
‘সভ্য-অসভ্য’ এই ভেদরেখার ধারণা মনুষ্যত্বহীন করার একটি কৌশল। এটি মানবাধিকারের পরিপন্থী এবং ঘৃণার রাজনীতিকে উসকে দেয়।
আমরা দেখেছি, মামদানির বিরুদ্ধে এই বিভ্রান্তিকর ও বিপজ্জনক ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো হয়েছে। অনেকে প্রকাশ্যে এমন কথাও বলেছেন, যেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা এখন একমাত্র ব্যাপক রাজনৈতিক ঐক্যের জায়গা।
কিন্তু ইসলামবিদ্বেষ শুধু মুসলিমদের ক্ষতি করে না, এটি গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। এই ধরণের ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র চলে না।
ঘৃণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি সম্প্রদায়কে রক্ষা করা নয়— এটা মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার রক্ষারও লড়াই।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মামদানি বলেন, ‘নিউইয়র্ক আর এমন একটি শহর হবে না যেখানে ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে কেউ নির্বাচনে জিতে যেতে পারে।’
তার এই বিজয় হয়তো নতুন এক পথে যাত্রার শুরু— যেখানে বিভেদের বদলে থাকবে সহানুভূতি, এবং ঘৃণার বদলে থাকবে সম্মান।
