আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ভারতের বিহারে নির্বাচন শুরু: ৭ কোটি ৪০ লাখ ভোটার, কী রয়েছে ঝুঁকিতে?
সারাহ শামীম
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০৪ পিএম
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদব এমন একটি নির্বাচনী লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন, যার ফলাফল ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য পেরিয়ে দেশজুড়ে প্রভাব ফেলতে পারে। [গেটি ইমেজেস]
ভারতের তৃতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাজ্য বিহারে বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট। প্রায় ১৭ মাস আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দিল্লিতে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠিত হলেও সেই সময় তুলনায় কম ম্যান্ডেট পাওয়ায় এই নির্বাচন শুধু বিহারের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো দেশের রাজনৈতিক আবহ বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে আগামী পাঁচ বছর বিহারের শাসন কে করবে। রাজ্যটি ভারতের সবচেয়ে গরিব হলেও এর ১৩ কোটি মানুষের ভোট অনেক বড় রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে।
বিহারের ২৪৩টি আসনের মধ্যে ১২১টিতে বৃহস্পতিবার ভোট হচ্ছে। এদের মধ্যে কিছু আসন তফসিলি জাতির (এসসি) জন্য সংরক্ষিত। রাজ্যের আইনসভা ‘বিধানসভা’ হচ্ছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কাঠামোর নিম্নকক্ষ। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত বিহারে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৪২.৩ শতাংশ। ২০২০ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত উপস্থিতি ছিল ৫৭ শতাংশ। বিহারে ভোটার সংখ্যা ৭৪ মিলিয়নেরও বেশি—যা যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
বর্তমান সরকার মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি এবং আঞ্চলিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডিইউ’র জোট। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময় বিহারের শাসক ছিলেন।
অন্যদিকে, আরজেডি বা রাষ্ট্রীয় জনতা দল নেতৃত্ব দিচ্ছে আরেকটি জোটকে, যার সঙ্গে আছে কংগ্রেস এবং ছোট ছোট দল। আরজেডির নেতৃত্বে আছেন তেজস্বী যাদব, যিনি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত লালু প্রসাদ যাদবের ছেলে।
এছাড়া, নির্বাচনে নতুন দল ‘জন সুরাজ’-ও রয়েছে, যেটি তৈরি করেছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোর। আগে তিনি বিজেপি ও কংগ্রেস—দু’দলের সঙ্গেই কাজ করেছেন।
প্রথম দফায় আরজেডির তেজস্বী যাদব রাঘোপুর আসনে লড়ছেন, যেখানে তিনি ২০১৫ ও ২০২০ সালেও জিতেছিলেন। তার বিপক্ষে লড়ছেন বিজেপির সতীশ কুমার ও জন সুরাজের চঞ্চল সিংহ। তেজস্বীর বাবা ও মা দুজনেই অতীতে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
বিজেপির প্রার্থী ও উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবার টারাপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। লোকগানের জনপ্রিয় শিল্পী মৈথিলী ঠাকুর আলিনগর আসনে বিজেপি প্রার্থী।
মূল ইস্যু হিসেবে রয়েছে—চাকরির সংকট, দারিদ্র্য, কৃষি-নির্ভর অর্থনীতির ধস এবং নারীদের অংশগ্রহণ। বিহারে নারীদের ভোটার উপস্থিতি পুরুষদের তুলনায় প্রায়ই বেশি হয়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট নারীদের জন্য ভাতাসহ নানা কল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিজেপিও নারীদের জন্য ‘মুখ্যমন্ত্রী নারী উদ্যোক্তা’ প্রকল্প চালু করেছে, যার অধীনে ৭৫ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৮৮০ মিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়েছে।
এই নির্বাচন মোদির জনপ্রিয়তারও একটি বড় পরীক্ষা। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই তাদের এখন জেডিইউ-এর মতো আঞ্চলিক দলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিহারের ৪০টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১২টি ও জেডিইউ ১২টি আসনে জয় পায়। লোক জনশক্তি পার্টি পায় ৫টি।
তবে রাজ্যে আরজেডির প্রভাবও প্রবল। ২০১৫ ও ২০২০—এই দুই নির্বাচনে দলটি সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছিল। ভোট ভাগেও দুই প্রধান জোটের ব্যবধান ছিল সামান্যই, কিন্তু বিজেপি-জেডিইউ মিলে সরকার গঠন করে।
এই নির্বাচন শুধু রাজ্যশাসন নয়, বর্ষীয়ান দুই নেতার—৭৪ বছরের নীতীশ কুমার ও ৭৭ বছরের লালু যাদবের মধ্যে শেষ রাজনৈতিক লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তারা চার দশকের বেশি সময় ধরে বিহার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন—কখনও মিত্র, কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে এই নির্বাচন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ, দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা এমনভাবে সংশোধন করেছে, যাতে বিজেপির সুবিধা হয়।
‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (Special Intensive Revision) কর্মসূচিতে ভোটারদের পরিচয়পত্রসহ নাগরিকতা প্রমাণ করতে বলা হয়। কিন্তু বিহারের মতো গরিব রাজ্যে, যেখানে সাক্ষরতার হার সবচেয়ে কম এবং জন্ম নিবন্ধন হারও কম, সেখানে লাখো মানুষ পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে ফেলা হয়েছে মূলত দরিদ্র, সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের—যারা ঐতিহাসিকভাবে আরজেডি-কংগ্রেস জোটকে ভোট দিয়ে আসছেন।
সীমাঞ্চল অঞ্চলে, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, সেখানে এই তালিকা সংশোধনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। এর মধ্যেই মোদি সীমাঞ্চলকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ঘাঁটি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যদিও এর পক্ষে কোনো তথ্য নেই।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, বিহারে অনুসৃত এই নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াটি এবার সারা দেশেই চালু করা হবে।
