সম্পূর্ণ নারী-নেতৃত্বাধীন ‘রূপান্তর দল’ ঘোষণা করলেন মামদানি
জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সম্পূর্ণ নারী-নেতৃত্বাধীন ‘রূপান্তর দল’ ঘোষণা করেছেন।
দলে আছেন লিনা খান (বাইডেন প্রশাসনের সময় ফেডারেল ট্রেড কমিশনের কমিশনার) এবং আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
বুধবার সকালে কুইন্সে এক সংবাদ সম্মেলনে ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী জানান, তিনি শহরের জন্য এক প্রজন্মে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতিমালা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিচ্ছেন। নতুন বছর, ১ জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু করবেন তিনি।
তিনি জানান, রূপান্তর দলটির নির্বাহী পরিচালক থাকছেন এলানা লিওপোল্ড। সহ-সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন মারিয়া টরেস-স্প্রিঙ্গার (নিউইয়র্কের সাবেক ফার্স্ট ডেপুটি মেয়র), লিনা খান (ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সাবেক চেয়ার), ইউনাইটেড ওয়ের সভাপতি গ্রেস বোনিলা, এবং সাবেক ডেপুটি মেয়র ফর হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস মেলানি হার্টজগ।
মামদানি বলেন, ‘আগামী মাসগুলোতে আমি আর আমার দল এমন এক সিটি হল গড়ে তুলব, যা এই প্রচারণার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম হবে। আমরা এমন প্রশাসন গড়ব, যা দক্ষ ও সহানুভূতিশীল—সততার ওপর দাঁড়ানো, আর নিউইয়র্কের কোটি মানুষের মতোই কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী।’
লিনা খানের অন্তর্ভুক্তি মামদানির আগ্রহকে স্পষ্ট করে—তিনি চান, সংস্কারকামী সাহসী নীতিনির্ধারকরা তার প্রশাসনের মূল শক্তি হয়ে উঠুক। খান বাইডেনের আমলে আক্রমণাত্মক অ্যান্টিট্রাস্ট প্রয়োগের জন্য জাতীয়ভাবে পরিচিতি পান এবং প্রগতিশীল ও পপুলিস্ট রিপাবলিকান উভয় শিবিরেই শ্রদ্ধা অর্জন করেন।
অ্যান্ড্রু কুওমো ও রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়াকে পরাজিত করার পর প্রথম টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মামদানি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব এই শহরের কাছে—১ জানুয়ারির জন্য প্রস্তুত থাকা। আমাদের হাতে ৫৭ দিন, আর এই ৫৭ দিন মানে প্রস্তুতির সময়।’
তার জয়ে নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলমান, দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত, আফ্রিকা-জন্ম, এবং শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ ব্যক্তি মেয়র হতে যাচ্ছেন।
তবে তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার হুমকি দিয়েছেন, যদি মামদানি মেয়র হন, তবে শহরকে ফেডারেল তহবিল দেওয়া বন্ধ করবেন। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘যদি মামদানি জয়ী হন, আমি বাধ্যতামূলক ন্যূনতম ছাড়া ফেডারেল তহবিল দেব না।’ তিনি প্রায়ই মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে আখ্যা দেন।
২০২৬ অর্থবছরে নিউইয়র্ক সিটির বাজেটের মোট ৬.৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭.৪ বিলিয়ন ডলার, ফেডারেল তহবিল থেকে আসে।
নির্বাচনের দিন ট্রাম্প আরও এগিয়ে যান। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘যে কোনো ইহুদি ব্যক্তি যদি প্রমাণিত ও স্বীকারোক্ত মুসলিমবিদ্বেষী জোহরান মামদানিকে ভোট দেয়, সে নির্বোধ।’ যদিও মামদানি বারবার ইহুদি-বিরোধিতার নিন্দা জানিয়েছেন।
এই প্রচারণা জুড়ে তিনি তীব্র ইসলামবিদ্বেষের মুখোমুখি হয়েছেন—ডেমোক্র্যাট, রিপাবলিকান, ও রক্ষণশীল বিশ্লেষক—সব দিক থেকেই। ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন ও টেনেসির অ্যান্ডি ওগলস ন্যায়বিভাগকে আহ্বান জানান, যেন মামদানির নাগরিকত্ব বাতিল করে তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। অক্টোবরের শেষ দিকে এক রেডিও অনুষ্ঠানে কুওমো হেসে বলেন, যদি আবার ৯/১১-এর মতো হামলা হয়, মামদানি হয়তো খুশি হবেন—এমন মন্তব্যে তিনি সঞ্চালকের সঙ্গে একমত হন। পরে মেয়র এরিক অ্যাডামসের পাশে দাঁড়িয়ে কুওমো মাথা নেড়ে বলেন, ‘নিউইয়র্ক যেন ইউরোপ না হয়ে যায়। দেখছেন তো, ইসলামিক উগ্রবাদের কারণে অন্য দেশে কী ঘটছে।’
রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান চিপ রয় এক মতামত লেখায় মামদানিকে ‘আধুনিক ডেমোক্র্যাট পার্টির মুখপাত্র’ বলে উল্লেখ করে সতর্ক করেন যে, তাঁর পেছনে চলছে এক ‘ইসলামিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব’।
একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে এক্স-এ মামদানিকে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী পোস্ট বেড়েছে ৪৫০ শতাংশ। প্রায় ৩৬ হাজার পোস্টে ১৭ হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট অংশ নিয়েছে, যেগুলোতে মোট ৭.৩৭ মিলিয়ন লাইক পড়েছে। এসব পোস্টের ৭২ শতাংশে তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানলেও মামদানি আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘আমরা যে নীতিগুলোর ওপর প্রচারণা চালিয়েছি, সেগুলো বাস্তবায়নে আমি আত্মবিশ্বাসী। রাজনীতি যাই হোক, আমাদের সমস্যা তো এক।’
তার প্রগতিশীল পরিকল্পনায় আছে—ভাড়ানিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া স্থগিত, ফ্রি বাস সার্ভিস, সার্বজনীন শিশুসেবা, এবং সিটি পরিচালিত মুদি দোকান—যার অর্থ আসবে ধনী ও করপোরেশনের ওপর বাড়তি কর থেকে।
তার প্রচারণায় ছোট দাতাদের কাছ থেকে গড়ে ৮০ ডলার অনুদান পেয়ে মোট তহবিল দাঁড়ায় ২০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি—নিউইয়র্কের ইতিহাসে রেকর্ড।
সেই রাতটি শুধু মামদানির নয়, সারা দেশে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের রাত ছিল। নিউ জার্সিতে মিকি শেরিল ও ভার্জিনিয়ায় অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হন। দুজনই সাবেক কংগ্রেস সদস্য এবং জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে অভিজ্ঞ।
ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা প্রস্তাব ৫০ পাস করেছে—গ্যাভিন নিউসমের রিডিস্ট্রিকটিং পরিকল্পনা, যা আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পাঁচটি আসন ডেমোক্র্যাটদের জন্য অনুকূল করবে। ম্যাসাচুসেটসের সামারভিলেও (টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের শহর) ভোটাররা প্রশ্ন ৩ পাস করেছেন—যাতে বলা হয়েছে, শহর যেন এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা না করে, যারা ‘ইসরায়েলের দখলদারি ও গণহত্যাকে টিকিয়ে রাখে’।
নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত প্রশাসন জানিয়েছে, খুব শিগগিরই ডেপুটি মেয়র ও বিভিন্ন দপ্তরের কমিশনারদের নাম ঘোষণা করা হবে। মামদানি বলেছেন, ‘কেউ পরিচিত মুখ হবে, কেউ নতুন। তবে সবার মিল থাকবে—পুরোনো সমস্যার নতুন সমাধান খোঁজার মানসিকতা।’
তিনি শেষে বলেন, ‘১ জানুয়ারি যখন নতুন প্রশাসন শপথ নেবে, তখন আমরা শুধু নতুন মেয়র নয়, নতুন এক যুগকেও স্বাগত জানাব। এই শহরটা যেন আমাদের সবার হয়, আর তার সাফল্য যেন আমাদের সবার গর্ব হয়।’

