আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
গাজায় সহিংসতা, শ্রমিকদের সামনে এখন নতুন দায়িত্ব
সামার জাবের
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫, ০১:৫৫ পিএম
গত ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি চলছে। কিন্তু সহিংসতা থেমে নেই। এই সময়ের মধ্যেই ইসরায়েল ২২০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। একদিনেই প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ।
ইসরায়েল এখনো সেই পরিমাণ মানবিক সহায়তা ঢুকতে দিচ্ছে না, যা যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে ঠিক হয়েছিল। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, ওষুধ, এমনকি জরুরি চিকিৎসার জন্য লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও তারা আটকে রাখছে।
অন্যদিকে পশ্চিম তীরের দখলীকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনা ও দখলদার বসতি স্থাপনকারীরা নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অক্টোবরে একটি ঘটনায়, মাত্র নয় বছর বয়সী এক শিশুকে তার বন্ধুর সঙ্গে ফুটবল খেলার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়।
৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১,০০০-র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১৩ জন শিশু।
এই সহিংসতা যুদ্ধবিরতির শর্ত ভাঙছে, কিন্তু বিশ্বশক্তির নীরবতা ও পশ্চিমা দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ফলে ইসরায়েলের দখলদার নীতি অব্যাহত থাকছে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে অনেকেই ভাবছেন—শুধু মিছিল যথেষ্ট নয়, এবার শ্রমিকদের এগিয়ে আসার সময়।
গত দুই বছরজুড়ে ইউরোপসহ নানা দেশে লাখো মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিল করেছে। কিন্তু সরকারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদাসীন থেকেছে।
আয়ারল্যান্ডের মতো দেশ, যারা ফিলিস্তিনের পক্ষে মুখ খোলে, তারাও ইসরায়েলের সঙ্গে বড় পরিসরে ব্যবসা করে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ড ইসরায়েলের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানির গন্তব্য ছিল।
বিক্ষোভ মিছিল অনেক সময় সরকারের ওপর চাপ কমিয়ে দেয়, যেন মানুষের রাগ প্রশমিত হয়ে যায়। কিন্তু শিল্পখাতে কর্মবিরতি বা ধর্মঘট সরকারের ওপর প্রকৃত চাপ তৈরি করে।
শ্রমিকরা অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তারা যখন কাজ বন্ধ রাখে, তখন উৎপাদন ব্যাহত হয়, খরচ বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে—এতে সরকার ও করপোরেশনগুলো চাপের মুখে পড়ে।
সংগঠিত ইউনিয়নগুলো এই ধরনের ধর্মঘট সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা রাখে। তারা স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারে।
সম্প্রতি ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পশ্চিমা দেশের শ্রমিকরা বড় ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে আয়ারল্যান্ডের ‘ডানেস স্টোরস’-এর শ্রমিকরা দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য ছোঁয়ার বিরোধিতা করে ধর্মঘটে গিয়েছিল।
একই বছরের নভেম্বর মাসে সান ফ্রান্সিসকোর বন্দরে শ্রমিকরা দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য খালাস করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এই সব আন্দোলনের প্রভাবে পশ্চিমা সরকারগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
২০২৪ সালে ইইউ ছিল ইসরায়েলের মোট পণ্যবাণিজ্যের ৩২ শতাংশের উৎস ও গন্তব্য। ইসরায়েলের সামরিক সরঞ্জামের অনেক অংশ ইইউ দেশগুলো থেকেই আসে।
এই বাণিজ্য রুদ্ধ করতে হলে, বন্দরগুলোতে ধর্মঘট গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু ইসরায়েলি পণ্যের পরিমাণ ইইউ-এর মোট বাণিজ্যের মাত্র ০.৮ শতাংশ, তাই এই বাণিজ্যে বাধা দিলে ইসরায়েল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু ইউরোপের অর্থনীতি মোটামুটি অক্ষতই থাকবে।
আরেকটি দিক হলো—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়, তার একটা বড় অংশ ইউরোপীয় বন্দরের মাধ্যমে হয়। যদি এই মধ্যবর্তী বন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ইসরায়েলের পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে ঘুরপথে যেতে হবে, এতে খরচ ও সময় অনেক বেড়ে যাবে।
ইউনিয়নগুলো চাইলে ইসরায়েলি দখলকৃত অঞ্চলে তৈরি পণ্যগুলোকেও নিষিদ্ধ করতে পারে। এমনকি চাইলে ইসরায়েল থেকে আসা বা সেখানে যাচ্ছে—এরকম কোনো পণ্যই তারা ছুঁবে না।
এর ফলে ছোট ও মাঝারি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর পক্ষে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন হয়ে উঠবে।
এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শ্রমিকদের এই পদক্ষেপ যদি সঠিকভাবে সংগঠিত হয়, তাহলে তা কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, বরং বাস্তব চাপ হিসেবে কাজ করবে।
সমর্থনের এই ঢেউ তৈরি করতে হলে ফিলিস্তিনপন্থী সংহতি গোষ্ঠীগুলোকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তারা জনমত গড়ে তুলতে পারবে, শিক্ষামূলক কাজ করতে পারবে, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারবে।
এই একযোগে পদক্ষেপ নিলে ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রে যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চলছে, তার বাস্তব ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।
সম্প্রতি ইতালির কর্মীরা গাজার পক্ষে জাতীয় ধর্মঘট ডেকে দেখিয়েছে, এ ধরনের সম্মিলিত পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হতে পারে।
ইসরায়েলের উপনিবেশ বিস্তার এবং দখলদারি শুধু সরকারের মাধ্যমে হচ্ছে না, বরং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার করপোরেশনগুলোর সক্রিয় সহযোগিতায় টিকে আছে।
এই করপোরেশনগুলো নিজ দেশে শ্রমিকদের শোষণ করে, মজুরি কমায়, শ্রম আইন দুর্বল করতে চায় এবং যুদ্ধ থেকে লাভ তোলে।
তারা সরকারকে চাপ দিয়ে ইসরায়েলকে সমর্থন করায়, অস্ত্র কিনে, এমন প্রযুক্তি কিনে যা ফিলিস্তিনিদের ওপর পরীক্ষা করে নিজের দেশের নাগরিকদের নজরদারিতে ব্যবহার করে।
তাই শ্রমিক ইউনিয়ন ও সংহতি গোষ্ঠীগুলোর যৌথভাবে একজোট হওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই জোট একদিকে যুদ্ধ ও দখলদারির বিরুদ্ধে যাবে, অন্যদিকে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার লড়াইটাকেও নতুন গতি দেবে।
বিশ্ব এখন দেখছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির মুখোশের আড়ালে আবারও ধীরে ধীরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
পূর্বের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, শুধু কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা প্রতীকী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
শুধু সমন্বিত বাস্তব পদক্ষেপেই ইসরায়েলের সহিংসতা থামানো সম্ভব।
ইউরোপের শ্রমিক ইউনিয়ন চাইলে এই মুহূর্তে ইসরায়েলের অর্থনৈতিক সরবরাহব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে।
এই যুদ্ধের জ্বালানির যোগান বন্ধ করে দিলে সরকার ও করপোরেশনগুলো চাপের মুখে পড়বে।
শুধু শ্লোগান দিয়ে বা মিছিল করে যুদ্ধ বন্ধ করা যাবে না। ফিলিস্তিনের শিশুহত্যা ঠেকাতে হলে, শ্রমিকদেরকেই এক হতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে, আর এই উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
