Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের সেনা তৎপরতা: ক্যারিবিয়ানজুড়ে গোপন প্রস্তুতি, লক্ষ্য কি ভেনেজুয়েলা?

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৩৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সেনা তৎপরতা: ক্যারিবিয়ানজুড়ে গোপন প্রস্তুতি, লক্ষ্য কি ভেনেজুয়েলা?

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সম্প্রতি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে পরিত্যক্ত এক নৌঘাঁটি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের প্রস্তুতি—যার লক্ষ্য হতে পারে ভেনেজুয়েলার ভেতরে কোনো সামরিক পদক্ষেপ।

পুয়ের্তো রিকোর রুজভেল্ট রোডস নামের পুরোনো নৌঘাঁটিতে ২০ বছরেরও বেশি সময় পরে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে ছবি তুলে দেখা যায়, রানওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ট্যাক্সিওয়েগুলো মেরামত ও পুনরায় পাকা করা হচ্ছে।

২০০৪ সালে নৌবাহিনী এই ঘাঁটি থেকে সরে যাওয়ার আগে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ নৌঘাঁটি। এর অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশাল জায়গা থাকায় সহজেই সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণ ও চলাচল সম্ভব—এ কথা জানিয়েছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা।

শুধু রুজভেল্ট রোডসই নয়, পুয়ের্তো রিকো ও সেন্ট ক্রয়েতে অবস্থিত বেসামরিক বিমানবন্দরেও সম্প্রসারণ চলছে। দুটি দ্বীপই ভেনেজুয়েলা থেকে মাত্র ৫০০ মাইল দূরে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা তিনজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও তিনজন সমুদ্রপথ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছেন। সবাই বলেছেন, এসব নির্মাণকাজ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার ভেতরে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) একজন সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার হার্নান্দেজ-রয় রয়টার্সকে বলেন, “এই ধরনের উদ্যোগ আসলে মাদুরো এবং তার আশপাশের জেনারেলদের ভীতি প্রদর্শনের জন্যই। এতে অভ্যন্তরীণ ভাঙন সৃষ্টি হতে পারে—এই আশায়।”

রয়টার্স গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেছে। স্যাটেলাইট ছবি, ফ্লাইট এবং জাহাজের গতিপথের তথ্য, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে তারা বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে।

১৯৯৪ সালে হাইতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ‘অপারেশন আপহোল্ড ডেমোক্রেসি’ চলাকালে বিশাল সেনা মোতায়েনের পর এটিই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি—যা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংশ্লিষ্ট নয়।

এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১৪টি অভিযানে অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে, যেগুলোতে সন্দেহভাজন মাদকবাহী জলযান ধ্বংস করা হয়েছে এবং ৬১ জন নিহত হয়েছেন।

এই অভিযানের ফলে ভেনেজুয়েলা এবং কলম্বিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে।

হোয়াইট হাউজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই অঞ্চলের মাদকচক্র মোকাবিলার।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, “তিনি মাদক-সন্ত্রাস মোকাবিলায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা নিরীহ আমেরিকানদের প্রাণহানি ঠেকাতে সাহায্য করেছে।”

অগাস্ট থেকে যুদ্ধজাহাজ, পারমাণবিক সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান ও নজরদারি বিমানের আগমন শুরু হয়েছে।

জেরাল্ড ফোর্ড বিমানবাহী রণতরী, প্রায় ১০,০০০ সেনা ও আধুনিক অস্ত্রসজ্জাসহ ক্যারিবিয়ান এলাকায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।

রুজভেল্ট রোডস ঘাঁটিতে সম্প্রতি ট্যাক্সিওয়েতে আধুনিকায়নের কাজ হচ্ছে, যাতে যুদ্ধবিমান এবং মালবাহী বিমান অবতরণ করতে পারে।

সিএসআইএস-এর উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান জানান, এ ধরনের সংস্কার কাজ যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল বৃদ্ধির প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চিত্র ও স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, রানওয়ের পাশে নতুন করে ২০টি তাঁবু বসানো হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টার সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে।

হার্নান্দেজ-রয় বলছেন, শুধু গর্ত ভরাটের কাজ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র যদি পশ্চিম গোলার্ধে নজর বাড়ায়, তাহলে এই পুরোনো ঘাঁটি পুনরায় সক্রিয় করাটা যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ।

পাশাপাশি পুয়ের্তো রিকোর রাফায়েল হার্নান্দেজ বিমানবন্দরেও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম আনছে। মোবাইল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার বসানো হয়েছে, যা যুদ্ধ কিংবা দুর্যোগকালীন ব্যবহারের জন্য তৈরি।

স্যাটেলাইট ছবিতে সেখানে রেপার ড্রোন ও গোলাবারুদ সংরক্ষণের স্থাপনা দেখা যাচ্ছে।

সেন্ট ক্রয়েতে হেনরি ই. রোহলসেন বিমানবন্দরেও নতুন রাডার বসানো হয়েছে এবং বিমানের পার্কিং স্পেস বাড়ানো হচ্ছে।

সেখানকার গভর্নর জানিয়েছেন, সৈন্য মোতায়েনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় থাকলেও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে তার জানা নেই।

হার্নান্দেজ-রয় বলেন, বড় পরিসরে বিমান চলাচল ও রাডার নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে, কারণ মাদক চোরাচালানকারীরা এখন জাহাজের বদলে বিমান ব্যবহার করতে পারে।

রাষ্ট্রদূতদের মতে, হাইতি হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন ও গাঁজা আসছে।

ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি মার্কিন সেনা রণতরীগুলোর উপস্থিতিও বাড়ছে।

উল্লেখযোগ্য কিছু জাহাজ ও তাদের অবস্থান:

এমভি ওসিয়ান ট্রেডার: বিশেষ বাহিনীর সহযোগী জাহাজ, ভেনেজুয়েলা উপকূল ও ক্যারিবিয়ান এলাকায় চলাচল করছে।

ইউএসএস গ্রেভলি, ইউএসএস স্টকডেল, ইউএসএস জেসন ডানহ্যাম: গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার হিসেবে মোতায়েন।

ইউএসএস ইওও জিমা, ইউএসএস স্যান অ্যান্টোনিও: আক্রমণভিত্তিক জাহাজ, সৈন্য পরিবহনে ব্যবহৃত।

ইউএসএনএস কমফোর্ট, ইউএসএনএস জোশুয়া হাম্পফ্রিজ: পুনরায় সরঞ্জাম পাঠাতে ও চিকিৎসাসেবা দিতে প্রস্তুত।

পাশাপাশি অন্তত এক ডজন গুপ্তচর বিমান—Poseidon P-8A—যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যারিবিয়ান ও বাহামার আকাশে ওড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

ফ্লাইট ডেটা অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে B-1B ল্যান্সার এবং B-52 স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বোমারু বিমান ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি টহল দিয়েছে।

শেষ কথা এখনো অজানা, তবে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রস্তুতি চলছে তা সরাসরি ভেনেজুয়েলায় প্রবেশের পথ তৈরি করছে—যা সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বলেছেন।

“এবার স্থলভাগে নামার পালা,” বলেছেন তিনি।

সূত্র: রয়টার্স

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন