আল জাজিরার বিশ্লেষণ
মালয়েশিয়ায় আসিয়ান সম্মেলন: কারা থাকছেন, কী আলোচনা হবে, কী প্রত্যাশা
এরিন হেইল
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫, ০১:১৯ পিএম
২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর কুয়ালালামপুরে আসিয়ান সম্মেলনে অংশ নিতে মালয়েশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমনকে কেন্দ্র করে, মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেয় ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনকারীরা। ট্রাম্পের মুখের কাটআউট হাতে তারা র্যালি করেন। ছবি: হাসনুর হুসেইন/রয়টার্স
রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আয়োজিত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন ‘আসিয়ান’-এর তিন দিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলন। এতে যোগ দিতে প্রায় দুই ডজন বিশ্বনেতা একে একে শহরে পৌঁছেছেন।
এটি আসিয়ানের ৪৭তম সম্মেলন।
এই বছর আসিয়ান পরিবারে নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হচ্ছে পূর্ব তিমুর। ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীনতা পাওয়া দেশটি বর্তমানে ১৪ লাখ মানুষের আবাসস্থল।
আসিয়ান গঠিত হয়েছে ১০টি দেশ নিয়ে—ব্রুনেই, কাম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এই দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৬৭৮ মিলিয়ন এবং সম্মিলিত জিডিপি ৩.৯ ট্রিলিয়ন ডলার।
সম্মেলনে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সেনা নেতৃত্বাধীন সরকারপ্রধান মিন অং হ্লাইং অংশ নিচ্ছেন না।
আসিয়ানের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’। এতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন।
রাশিয়ার পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেবেন।
এছাড়া ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও কুয়ালালামপুরে এসেছেন।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ফিফার প্রধানরাও কয়েকটি অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘বারনামা’।
রবিবার সম্মেলনের ফাঁকে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়া তাদের সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থামাতে একটি চুক্তিতে সই করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত থাকবেন ট্রাম্প ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
জুলাই মাসে এই সীমান্তে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন, লাখো মানুষ ঘরছাড়া হন। পাঁচ দিনের মধ্যে চীন, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়।
তবে সাবেক কাম্বোডীয় বিরোধী নেত্রী মু সোচুয়া মনে করেন, চুক্তি যতটা না টেকসই, তার চেয়ে বেশি এটি হতে যাচ্ছে ‘ফটোসেশন’। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চাপ দুই দেশকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়। সমালোচকদের মতে, এটা এক ধরনের অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল—শান্তির বদলে বাণিজ্য সুবিধা আদায়।’
কী আলোচনা হবে সম্মেলনে
আসিয়ান সম্মেলনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজের প্রবেশাধিকার—যা উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং যার উৎপাদনের বড় অংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘লিবারেশন ডে ট্যারিফ’ নামে একধরনের নতুন শুল্ক আরোপ করেন। এর লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। আলোচনার পর বেশিরভাগ আসিয়ান দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। ব্রুনেইয়ের জন্য এই হার ২৫ শতাংশ। লাওস ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে শুল্ক ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
এই শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় চীন ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজ রপ্তানিতে কঠোরতা আনায়, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী।
ডেজান শিরা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস-এর আসিয়ান পরিচালক মার্কো ফস্টার আল জাজিরাকে জানান, অনেক দেশই এই সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ খুঁজবে। তিনি বলেন, ‘প্রায় সবাইই চায় ট্রাম্পের সঙ্গে একান্তে দেখা করতে, নিজেদের বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে।’
আলোচনায় থাকবে আরও কিছু জ্বলন্ত ইস্যু
সম্মেলনে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া স্ক্যাম সেন্টার নিয়েও আলোচনা হবে। অপরাধ চক্রগুলো এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করছে।
কেন মিয়ানমার অংশ নিচ্ছে না
২০২১ সাল থেকে গৃহযুদ্ধে জড়ানো মিয়ানমার এ বছর সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে না। ফলে আগামী বছর সংগঠনের নেতৃত্বও দেশটি পাচ্ছে না। মালয়েশিয়ার পরিবর্তে দায়িত্ব যাবে ফিলিপাইনের হাতে।
২০২১ সালে আসিয়ান একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা নেয়, যেখানে মিয়ানমারে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং একটি বিশেষ দূত নিয়োগের কথা বলা হয়। কিন্তু চার বছর পরও তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি খুবই কম বলে মনে করেন সমালোচকেরা।
আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-এর সহ-সভাপতি চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, ‘মিয়ানমার এখন গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি জানান, গৃহযুদ্ধের কারণে মাদক ও অস্ত্র পাচার বেড়েছে এবং শরণার্থী সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে সান্তিয়াগো আশাবাদী নন। তার মতে, ‘এই সম্মেলন অনেকের জন্য ছবি তোলার সুযোগ হতে পারে, কিন্তু বাস্তবিক কোনো নীতিগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।’
আসিয়ানের সীমাবদ্ধতা কী?
আসিয়ানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—এটি কোনো বাধ্যতামূলক আইন প্রয়োগ করে না। সদস্য দেশগুলোকে তাদের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করা হয় না। এদিক থেকে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়ে আলাদা, যেখানে সদস্য দেশগুলোকে ইইউ আইন ও রায় মানতে হয়।
এই সমালোচনা বিশেষ করে মিয়ানমার ইস্যু ও থাই–কাম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়ে আরও জোরালো হয়েছে।
মার্কো ফস্টার বলেন, আসিয়ান গঠিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর। সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ভিত্তি করেই এর কাঠামো তৈরি।
তিনি বলেন, ‘আসিয়ান এমন এক ধারণার ওপর গড়ে উঠেছে, যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব সদস্য দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করবে না। তাই আসিয়ানে ‘জাতি’ সর্বাগ্রে—এটাই এর বৈশিষ্ট্য।’
