ট্রাম্পের এশিয়া সফর: কূটনৈতিক যাত্রা শুরুর আগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব শিগগিরই এশিয়া সফরে যাচ্ছেন। অনেকেই আশাবাদী, এই সফর বাণিজ্য নিয়ে চলমান টানাপোড়েন কিছুটা হলেও কমাবে এবং চীনের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক কিছুটা ঠিক করার সুযোগ এনে দেবে।
এই সফর শুরু হবে রোববার, মালয়েশিয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটি বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি জাপানে যাবেন, যেখানে তিনি সে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ি তাকাইচির সঙ্গে দেখা করবেন।
তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি ঘটবে মাসের শেষে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত এপেক সম্মেলনে। সেখানেই চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা। আলোচনায় বাণিজ্যই মুখ্য থাকবে, তবে তাইওয়ান নিয়েও কথা হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও শির বৈঠক হতে পারে আগামী বৃহস্পতিবার। তবে আলোচনার বিষয় কী হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এই বৈঠক ঘিরে দুনিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমিয়ে আনার চাপ বাড়ছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, চীনকেও ছাড় দিতে হবে। এর মধ্যে আছে—মার্কিন সয়া বিনের আমদানি ফের শুরু করা, ফেন্টানিল নামের মাদকের উপাদান রপ্তানি কমানো, এবং বিরল ধাতুর রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। এই ধাতুগুলো প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শিল্পখাত, যেগুলো আগেই ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ট্রাম্প আশাবাদী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা চীনের সঙ্গে অসাধারণ একটি চুক্তিতে পৌঁছাবো... যা পুরো বিশ্বের জন্যই দারুণ হবে।’
সময় খুব সীমিত। কারণ শি ও ট্রাম্পের এই বৈঠকের সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা।
এই বৈঠকে তাইওয়ান নিয়েও আলোচনা হতে পারে। আশঙ্কা রয়েছে, শির চাপের মুখে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের তাইওয়ান-সমর্থন নিয়ে নরম হতে পারেন। চীন ইতোমধ্যে হোয়াইট হাউসের কাছে অনুরোধ করেছে, তারা যেন প্রকাশ্যে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। চীনের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন, কারণ তারা তাইওয়ানকে নিজেদের প্রদেশ বলেই মনে করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প কি শুল্ক চুক্তি করবেন?
ট্রাম্প এবারের আসিয়ান সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলের ১০টি দেশের সম্মিলিত রপ্তানি ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ছিল ৩১২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ২০১৭ সালে ছিল মাত্র ১৪২ বিলিয়ন। এসব দেশের ওপর নির্ভর করেই চলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন-ভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা।
ট্রাম্প তার ‘রিসিপ্রোকাল’ শুল্ক নীতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু পণ্যে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন। এ নিয়ে আসিয়ান নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২০১৭ সালের পর এই প্রথমবার ট্রাম্প আসিয়ান সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। রোববার তার এই অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। আলোচনায় প্রধানত থাকবে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড—দুটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির বড় উৎস।
আরেকটি যুদ্ধের অবসান?
মালয়েশিয়া সফরের আরেকটি কারণ হতে পারে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা। এই দুই দেশের সীমান্ত বরাবর ৮১৭ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।
গত জুলাই মাসে পাঁচ দিনের সংঘর্ষে অনেক মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ৩ লাখ মানুষ গৃহহীন হন। এরপর মালয়েশিয়া একটি হালকা যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করে। কিন্তু মূল বিরোধ এখনও মেটেনি।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান বলেন, ট্রাম্প এই সম্মেলনে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর দেখতে আগ্রহী। যদি তা হয়, তাহলে ট্রাম্প নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তিদূত হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
কিম জং উনের সঙ্গে আবার দেখা হবে?
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে কখনও কিছুই একেবারে বলা যায় না। আপাতত উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা খুব কম। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা যেহেতু ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে, ট্রাম্প আবারও তার ‘বন্ধু’ কিমের দিকে মন দিতে পারেন।
তবে অতীতে তার তিনবার কিমের সঙ্গে বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি—২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই সম্মেলন এবং পরে হঠাৎ করে দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যবর্তী সীমান্তে এক সাক্ষাৎ—সবই ব্যর্থ হয়।
তারপর থেকে কিম ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চালিয়ে গেছেন। তিনি ১০ হাজারেরও বেশি সেনা পাঠিয়েছেন রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনে লড়তে, এবং চীন-মস্কোর সঙ্গে একটি অঘোষিত জোট গড়েছেন।
ট্রাম্পের দক্ষিণ কোরিয়া পৌঁছানোর কয়েকদিন আগেই উত্তর কোরিয়া দুটি স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে দাবি করে, এটি একটি ‘হাইপারসোনিক সিস্টেম’-এর সফল পরীক্ষা, যার লক্ষ্য হলো পারমাণবিক প্রতিরক্ষা জোরদার করা।
এই প্রেক্ষাপটে কিমকে নিয়ে আবার কোনো ঝুঁকি নেওয়া আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
জর্জিয়ায় আইস ইমিগ্রেশন অভিযান কি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছে?
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন সংস্থা আইস দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন একটি ব্যাটারি কারখানায় অভিযান চালায়, যেটি তখন নির্মাণাধীন ছিল। প্রায় ৩০০ দক্ষিণ কোরিয়ান নাগরিককে আটক করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দেশটির সাধারণ মানুষ এখনও বিষয়টি ভুলতে পারেনি।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং, যিনি বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, তার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে।
তাদের আলোচনায় শীর্ষে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে চুক্তির বিষয়টি। এই চুক্তি গ্রীষ্মে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কিছু বিষয়ে মতবিরোধের কারণে তা আটকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে—দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের ধরন কেমন হবে তা নিয়ে মতপার্থক্য।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করতে রাজি হয়েছে—যেটা জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গাড়িগুলোর ওপর প্রযোজ্য হার।

