Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

গাজা যুদ্ধবিরতির পর নতুন বাস্তবতা: ন্যায় না পুনর্বিন্যাস?

Icon

লায়লা সানসুর

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫, ১১:২০ এএম

গাজা যুদ্ধবিরতির পর নতুন বাস্তবতা: ন্যায় না পুনর্বিন্যাস?

লন্ডন, ১১ অক্টোবর ২০২৫—গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে প্যালেস্টাইন কোয়ালিশনের আয়োজনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন [জেইমি জয়/রয়টার্স]।

গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর এখন দুই ধরনের আলোচনা চলছে—একটা নীরব, হিসেবি, আঞ্চলিক; অন্যটা তীব্র, নৈতিক, এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া।

প্রথমটি হচ্ছে কূটনীতিক, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যকার আড়ালের কথাবার্তা। দ্বিতীয়টি ছড়িয়ে আছে আমাদের সময়রেখায়, মানুষের ক্ষোভ আর সংহতিতে ভরা—যা ভয়াবহতার প্রতি স্বাভাবিক ও মানবিক প্রতিক্রিয়া।

প্রথম আলাপচারিতায় নতুন শক্তির মানচিত্র আঁকা হচ্ছে। আর দ্বিতীয়টি বলছে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার গল্প।

যদি মন দিয়ে শোনা যায়, তাহলে আঞ্চলিক রাজধানীগুলো থেকে এক ধরনের স্পষ্ট বার্তা আসে—এই যুদ্ধ শেষ। শুধু অস্ত্রের ভাষায় নয়, রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাদের চোখে এই চুক্তি একটি ‘ফিরে না যাওয়ার মোড়’।

গাজায় ঘটে যাওয়া বিপর্যয় এখন আর শুধু স্থানীয় সংকট নয়—এটা একটা বড় রকমের পুনর্বিন্যাসের সূচনা, যা শুধু ফিলিস্তিন নয়, ইসরায়েলকেও নাড়িয়ে দেবে। বদলে যাবে ফিলিস্তিনি রাজনীতি। নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।

এই নতুন হিসাবনিকাশে হামাস, এমনকি পুরো রাজনৈতিক ইসলাম আন্দোলনকেই মূলধারার রাজনীতি থেকে ছাঁটাই করে ফেলা হচ্ছে। অঞ্চলজুড়ে যে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে, তারা স্থিতিশীলতা, ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রিত আধুনিকতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের চোখে এসব আন্দোলন এখন শুধু বিশৃঙ্খলার পুরোনো চিহ্ন।

এই চিন্তাধারা পশ্চিম তীরেও বিস্তৃত হবে। কারণ নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় শাসনক্ষমতা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আরব রাষ্ট্রগুলোর পরিকল্পনা হলো—নির্বাচিত কিছু ইসলামি ও আন্তর্জাতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে পশ্চিম তীরকে অস্থায়ী প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানে রাখা হবে। এটা হবে একধরনের ‘পরিচালিত রূপান্তর’।

এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে একটি শেষ সুযোগ দেওয়া হবে নিজেদের সংস্কারের। একটি নিরপেক্ষ টেকনোক্র্যাট দল তাদের দেখভাল করবে—প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, গাজা শাসন এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি—সবকিছুর দায়িত্বে তারা থাকবে।

তবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই সংস্কার মানতে না চাইলে, তারা বিচ্ছিন্ন ও আর্থিকভাবে অচল হয়ে পড়বে।

অনেকেই এটিকে সংস্কার নয়, বরং ফাঁদ বলেই দেখবেন। কারণ যারা এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। তাদের লক্ষ্য একটাই—এমন নেতৃত্ব তৈরি করা, যারা রাস্তায় ক্ষোভ সামলাতে পারবে, আবার আলোচনার টেবিলেও থাকবে।

ফিলিস্তিনিদের কোনো রাজতন্ত্র নেই, নেই কোনো বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব। তাই ভোটই একমাত্র পথ—যদিও সেটিও এখন অনেকটাই বাইরের শক্তির কৌশলের ওপর নির্ভরশীল।

দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া পিএলও হয়তো খুব শিগগিরই কেবল ‘মুক্তির দলগুলোর’ আনুষ্ঠানিক ছাতার নিচে রয়ে যাবে—ঘোষণা, আবেদন আর অনুদান চাওয়ার রাজনৈতিক কাঠামো। যারা প্রাসঙ্গিক থাকতে চান, তাদের নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে হবে—বেসামরিক দল হিসেবে, পুরোনো বিপ্লবী ভাবনা বাদ দিয়ে।

এটাই এখন নীতিনির্ধারকদের চোখে অনিবার্য ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ কেউ প্রকাশ্যে বলছে না, কিন্তু অমান করে নিচ্ছে—আম্মান থেকে কায়রো, রিয়াদ থেকে পশ্চিমা রাজধানীগুলো পর্যন্ত।

কিন্তু এখানেই রয়েছে বিরাট ফাঁক।

 যখন ভেতরের কক্ষগুলোতে ‘ব্যবস্থা’, ‘নিয়ন্ত্রণ’ আর ‘পরিকল্পনা’র কথা হয়, তখন বাইরে মানুষজন এসবকে দেখে ধোঁকাবাজি হিসেবে। এ যেন ন্যায়ের সব রঙ তুলে ফেলে শুধু শক্তির খেলা।

অ্যাক্টিভিস্ট, সংহতির কর্মীরা এসব পরিকল্পনাকে নতুন কোনো ব্যবস্থাপনা নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতা বলে দেখছেন। তারা বিশ্বাস করতে পারছে না—না ইসরায়েলের প্রতি, না আমেরিকার প্রতি, এমনকি না তাদের নিজেদের অঞ্চলজুড়ে থাকা সরকারের প্রতিও, যারা এখন টাকা আর ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তাদের সন্দেহ করা ভুল নয়।

তবুও একেবারে হতাশা আর অন্ধ আশার মাঝখানে আছে এক জায়গা, যার নাম বাস্তবতা—এটা কোনো আত্মসমর্পণের বাস্তবতা নয়, বরং বোধের।

 এই যে নতুন কাঠামো তৈরি হচ্ছে, সেটা ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নয়, বরং ন্যায় কী করতে পারবে বা পারবে না, সেই সীমারেখা। একে উপেক্ষা করা মানে আবারও নিয়ন্ত্রণ হারানো।

গাজার ভূমিকম্প বদলে দিয়েছে এই সংঘাতের ব্যাকরণ। ইসরায়েলের শক্তি যতই নির্মম হোক, এখন তা আর একক নয়। আঞ্চলিক রাজনীতিতে চলছে বড় ধরনের পরিবর্তন। একটা নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে—যারা এতে জায়গা করে নিতে পারবে না, তারা হয়তো কেবল পাদটীকায় ঠাঁই পাবে—লেখা থাকবে, তারা বদলাতে চায়নি।

আমার মতে, বাস্তববাদ আর নৈতিকতার এই দুই পথ এখন পাশাপাশি চলছে—কখনও পরস্পরকে আঘাত করছে, কখনও একে অন্যকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে।

এই দ্বন্দ্বের মাঝেই আরেকটি বড় বিভাজন—একদিকে ইসরায়েলের আগ্রাসী সম্প্রসারণ, যেটা প্রতিটি শান্তি ও ন্যায়ের কাঠামোকে ধ্বংস করছে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক ক্ষমতাগুলোর হিসেব-নিকেশ—যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত।

সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এই দ্বন্দ্ব আরও অস্থিরতা আনবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি বাধ্য হয়ে চীন ও রাশিয়ার দিকে সরে যাবে, যখন পশ্চিমা জনগণের সমর্থন ইসরায়েলের অব্যাহত ছাড়ের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, তখন এই আঞ্চলিক বাস্তববাদীরাই হয়তো শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।

এই সময়েও সংহতির কণ্ঠ থেমে যাবে না। তারা কথা বলবে অধিকার, স্মৃতি, এবং নৈতিকতার ভাষায়। এই কণ্ঠ প্রয়োজনীয়—কারণ রাজনীতি অনেক সময় যা ভুলে যায়, সেটাই মনে করিয়ে দেয় এই কণ্ঠ।

ইতিহাসের ধারা আপনাআপনি ন্যায়ের দিকে যাবে না—তাকে টেনে নিতে হয়। যাদের স্মৃতিভ্রংশ হয় না, যারা সুবিধার বিনিময়ে মূল্যবোধ বিক্রি করে না, তারাই টানে।

প্রবাসী ফিলিস্তিনি এবং বিশ্বের যারা সংহতির কারণে নড়েচড়ে বসেছেন, তাদের জন্য সামনে পথ স্পষ্ট।

 তাদের প্রতিরোধ করতে হবে সেই মধুর প্রতিশ্রুতির—যা শুধু শান্ত করতে আসে: কিছু স্বীকৃতি, কিছু প্রস্তাব, কিছু পুনর্গঠনের আশ্বাস। সেসব গ্রহণ করা যায়, কিন্তু সেগুলো যেন পরিবর্তনের ছদ্মবেশ না হয়।

ভবিষ্যতের জন্য লড়াইটা হতে হবে—মাঠে বাস্তব পরিবর্তনের, এবং জবাবদিহিতার। গাজায় গণহত্যার পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের একদিন আইনের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে—প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের অর্থ ফিরিয়ে আনতেই।

এইভাবে লড়াই টিকে থাকবে—একটা জাতির জন্য নয় কেবল, বরং এই সময়ের মূল্যবোধের মাপকাঠি হিসেবেও।

আরেকটা বড় কাজ আছে, যেটা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়—মাঠে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা। এখন একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে—অল্প জায়গা, অনিশ্চিত, কিন্তু বাস্তব। সেই জায়গাটা দখল করতে হবে।

আগামী প্রজন্মকে বুঝতে হবে—শুধু প্রতিবাদ, মন্তব্য বা সাক্ষী হয়ে থাকা যথেষ্ট নয়। কেউ নেতৃত্বের সুযোগ দেবে না, সেই জায়গা নিজেকেই নিতে হবে—উদ্যোগ, স্বচ্ছতা আর সংগঠনের কঠিন পরিশ্রম দিয়ে।

ফিলিস্তিন যখন আবার রাজনীতির শূন্য বিন্দুতে ফিরে যাচ্ছে, তখন যারা নতুন ধরনের নেতৃত্ব দেখতে চায়, তাদের নেমে আসতে হবে—নীতি তৈরির কাজে, সংগঠন গড়ার কাজে, অর্থায়নের কাজে।

কারণ, কেবল নতুন রাজনৈতিক শক্তি, এবং এমন ভাষা—যা রাস্তাও বোঝে, ক্ষমতার ঘরেও কথা বলতে পারে—সেই ভাষাই ফিলিস্তিনিদের নতুন পর্বে আবারও নিজের কণ্ঠ ফিরিয়ে দিতে পারে।

লায়লা সানসুর
লায়লা সানসুর একজন ফিলিস্তিনি-ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক। তিনি ‘ওপেন বেথলেহেম’ নামের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা এবং নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিন বিষয়ক নানা ইস্যুতে মতামত প্রকাশ করে থাকেন।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন