আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ভারতে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলায় মুসলিমদের ধরপাকড়, বাড়ি ভাঙচুর
ইয়াশরাজ শর্মা
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫, ০১:৩৬ পিএম
গত এক মাসে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম পুরুষদের ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনেককে, কিছু কিছু জায়গায় তাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ—তারা সামাজিক মাধ্যমে, জামা বা পোস্টারে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লিখেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির শাসিত রাজ্যগুলোতে এই ঘটনা বেশি ঘটেছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এই লেখাগুলো ‘সর্বসাধারণের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য হুমকি’।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা এপিসিআর (Association for Protection of Civil Rights) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৪০ জনের বেশি মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ২৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
৪ সেপ্টেম্বর, উত্তরপ্রদেশের কানপুর শহরে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে একটি মহল্লায় ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা আলোকিত বোর্ড লাগানো হয়।
বোর্ডটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘আই লাভ নিউইয়র্ক’ স্লোগানের আদলে বানানো।
প্রথমে কিছু স্থানীয় হিন্দু প্রতিবাদ করেন, কারণ, উত্তরপ্রদেশে কোনো ধর্মীয় উৎসবে নতুন কোনো অনুষঙ্গ যোগ করাকে আইনগতভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।
কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আরও কঠোর অভিযোগ আনে—ধর্মের ভিত্তিতে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ। এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।
এই ঘটনার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে তেলেঙ্গানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, জম্মু ও কাশ্মীরসহ অনেক রাজ্যে।
‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা দেখা যায় পোস্টারে, জামায়, এমনকি অনেকে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই স্লোগান লেখেন।
কানপুর থেকে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরে, উত্তরপ্রদেশেরই বিয়ারেলিতে ২৬ সেপ্টেম্বর পুলিশের সঙ্গে মুসলিম প্রতিবাদকারীদের সংঘর্ষ হয়।
পরদিন, স্থানীয় ইমাম তওকির রজাসহ অন্তত ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার আত্মীয়দের বাড়িও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
পাশাপাশি, আরও কয়েকটি রাজ্যে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে শুধুমাত্র এই স্লোগান লেখা জামা পরার জন্য বা একই কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখার জন্য।
ভারতের সংবিধানে নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে।
সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার এবং ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যদি না তা সরাসরি সহিংসতা বা ঘৃণা ছড়ায়।
তবে, এই গ্রেপ্তারগুলোর পেছনে পুলিশ এমন ধারায় মামলা করেছে—যার মধ্যে বড় জমায়েত, শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা ‘উস্কানি’র অভিযোগ থাকে।
মানবাধিকারকর্মী নাদিম খান বলেছেন, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা কোনোভাবেই অপরাধ নয়, এটা ভালো করেই জানে প্রশাসন। তারা এমন ধারাগুলো ব্যবহার করছে, যাতে করে মুসলিমদের কণ্ঠরোধ করা যায়।
তিনি বলেন, ‘হিন্দু দেবতাদের অস্ত্রধারী ছবিগুলো তো সর্বত্র দেখা যায়। তাও কি মুসলিমদের জন্য হুমকি? তাহলে কেন একপক্ষের ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশকে দণ্ডযোগ্য মনে করা হচ্ছে?’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে এমন বহু মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন—কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া, কোনো আদালতের আদেশ ছাড়াই।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, শাস্তি দেওয়ার জন্য ঘরবাড়ি ভাঙা যাবে না।
তবুও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব নিয়ম অনেক সময়ই মানা হয় না।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের গণতন্ত্র সূচকে অবনতি হচ্ছে।
হেট স্পিচ বা ঘৃণামূলক বক্তব্যের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ।
২০২৩ সালে এর সংখ্যা ছিল ৬৬৮টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৬৫টিতে। এর অধিকাংশই বিজেপি শাসিত রাজ্যে ঘটেছে, কিংবা যেখানে নির্বাচন আসন্ন ছিল।
নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারত শাখার প্রধান আকার প্যাটেল বলেন,
‘শান্তিপূর্ণভাবে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলার মধ্যে কোনো হুমকি নেই। এটা কোনোভাবেই আইনত দণ্ডযোগ্য হতে পারে না—না ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, না আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করা, বিশ্বাস দমন করা নয়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা কোনো বিকল্প নয়, এটি আইনগত দায়িত্ব।’
