যুদ্ধবিরতির মধ্যে দিয়ে গাজার উপকূল ধরে শনিবার উত্তরের দিকে ফিরছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কেউ হাঁটছেন, কেউ গাড়িতে, আবার কেউ ঠেলাগাড়িতে। সবার লক্ষ্য—ফেলে আসা ভেঙে যাওয়া ঘরে ফেরা।
নিজের মেয়ের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন নাবিলা বাসাল। বললেন, ‘এই অনুভূতির কোনো ভাষা নেই; আল্লাহর শুকরিয়া। খুব খুশি, যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কষ্টের সময়টা কেটে গেছে।’
এই যুদ্ধবিরতি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় করা এক চুক্তির মাধ্যমে। এর প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনারা কিছুটা পিছু হটেছে। দুই বছরের রক্তাক্ত সংঘাতের পর যেন কিছুটা আশার আলো দেখছে গাজা।
বাড়ি নয়, ধ্বংসস্তূপ
ফেরার পথে অনেকেই দেখেছেন তাদের ঘরবাড়ি আর নেই। গাজা শহরের এক ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আহমেদ আল-জাবারি বলছিলেন, ‘যে বাড়ি আমি ৪০ বছর আগে তৈরি করেছিলাম, এক মুহূর্তেই সব শেষ। ভালো লাগছে যে আর রক্তপাত নেই, কিন্তু এখন যাব কোথায়? আর কতদিন তাঁবুতে থাকব?’
এদিকে ইসরায়েলেও এক ভিন্ন চিত্র। সন্ধ্যা নামার পর তেলআবিবের হোস্টেজ স্কয়ারে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। দুই বছরের কান্না আর প্রতিবাদের শেষে এবার তাদের মুখে আনন্দের সুর।
মঞ্চে উঠে আসেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প, আর মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ, যিনি যুদ্ধবিরতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘এই রাতের স্বপ্ন আমি বহুদিন ধরেই দেখছিলাম।’
বক্তব্যের সময় কেউ কেউ চিৎকার করে বলেন, ‘ধন্যবাদ ট্রাম্প, ধন্যবাদ উইটকফ!’ তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নাম উঠলে কিছুটা অসন্তোষও প্রকাশ পায়।
উইটকফ বলেন, ‘যারা বন্দি ছিলেন, তারা যখন আপনজনের কাছে ফিরবেন, পুরো ইসরায়েল এবং বিশ্ব তাদের আলিঙ্গনে নিতে প্রস্তুত।’
প্রতীক্ষা মুক্তির
চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা বড় শহরগুলো থেকে সরে যাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ সোমবার দুপুরের মধ্যে হামাসকে তাদের হাতে থাকা বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে।
হাগাই আংগ্রেস্ট বলেন, ‘আমরা খুবই উত্তেজিত। আমাদের ছেলে মাতানসহ ২০ জন এখনও জীবিত বলে ধারণা। আমরা সেই ফোনকলের অপেক্ষায় আছি।’ এখন পর্যন্ত ২৬ জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে, আরও দুজনের খোঁজ নেই।
চুক্তির অংশ হিসেবে, বন্দিমুক্তির পর ইসরায়েল প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দেবে। গাজায় ঢুকবে শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক—খাবার, ওষুধ, জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, তারা অপুষ্ট শিশুদের জন্য উচ্চ-পুষ্টিসম্পন্ন খাবার ও স্বাস্থ্য উপকরণ রোববার থেকেই সরবরাহ শুরু করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, ইসরায়েলি সেনাপ্রধান আয়াল জমিরের সঙ্গে গাজা সফর করেছেন। কুপার বলেন, গাজায় স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। তবে মার্কিন সেনারা গাজায় অবস্থান করবে না।
শান্তির পথে ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার মিশরের শারম এল শেখে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে অংশ নেবেন, যেখানে ২০টিরও বেশি দেশের নেতা উপস্থিত থাকবেন। ট্রাম্প পরে ইসরায়েল সফরে গিয়ে দেশটির সংসদ ‘কনেসেট’-এ ভাষণ দেবেন—২০০৮ সালের পর প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তির চুক্তি কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে? ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার অনেক কিছুরই এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। গাজা কে চালাবে, হামাসের ভবিষ্যৎ কী—এই সবই এখনো অনিশ্চিত।
তবুও ট্রাম্প আশাবাদী। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। শান্তিই এখন সবার চাওয়া।’
এই যুদ্ধের শুরু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। সেদিন হামাস ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকা, সেনাঘাঁটি এবং একটি সঙ্গীত উৎসবে হামলা চালায়। মারা যায় ১,২০০ জন, বেশিরভাগই বেসামরিক মানুষ। বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় ২৫১ জনকে।
পাল্টা হামলায় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে চালানো যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রাণ গেছে ৬৭ হাজার ফিলিস্তিনির, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক।
এখন, যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে গাজার মানুষ ফিরছেন তাদের ভাঙা ভিটেয়—এক নতুন ভোরের আশায়।

