Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের উপর ভরসা: জিম্মি ছাড়ার ঝুঁকি নিল কেন হামাস

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫, ১১:৪৪ এএম

ট্রাম্পের উপর ভরসা: জিম্মি ছাড়ার ঝুঁকি নিল কেন হামাস

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে হামাসের ভাষ্য খুব একটা ইতিবাচক ছিল না। তারা তাকে ‘বর্ণবাদী’, ‘অরাজকতার রেসিপি’ এবং গাজার জন্য ‘অবাস্তব কল্পনার মানুষ’ বলে উল্লেখ করেছিল।

তবে গত মাসে এক ব্যতিক্রমী ফোনালাপ হামাসের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বদলে দেয়। দুইজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানান, সেই কথোপকথনের পর হামাস ভাবতে শুরু করে, হয়তো এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে একটি শান্তিচুক্তিতে বাধ্য করতে পারেন — এমনকি যদি হামাস সব জিম্মিকে ছেড়ে দেয়, যে জিম্মিদের মাধ্যমে তারা যুদ্ধের ময়দানে কিছুটা প্রভাব রেখেছিল।

ফোনালাপটি তখন ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের পর ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোনে যুক্ত করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল দোহায় হামাস নেতাদের থাকার ভবনে ইসরায়েলি হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা।

এই হামলায় হামাসের গুরুত্বপূর্ণ আলোচক খালিল আল-হাইয়াসহ অন্য নেতারা বেঁচে যান। হামাসের কর্মকর্তাদের মতে, এই ঘটনার প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান তাদের মধ্যে বিশ্বাস জাগায়—তিনি ইসরায়েলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন এবং গাজায় যুদ্ধ থামাতে তিনি আন্তরিক।

বুধবার, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি অস্ত্রবিরতিতে হামাস সম্মতি দেয়। এতে তারা সব জিম্মিকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়, যদিও এতে পূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার চুক্তিতে নেই। হামাসের আরও দুই কর্মকর্তা স্বীকার করেন, এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উপর নির্ভর করে—তিনি যেন চুক্তি ব্যর্থ না হতে দেন।

তবে হামাস জানে, এই সিদ্ধান্তের ফল উল্টোও হতে পারে। তারা আশঙ্কা করছে, জিম্মি মুক্তির পর ইসরায়েল হয়তো আবারও আগ্রাসন শুরু করবে—যেমনটি ঘটেছিল জানুয়ারির অস্ত্রবিরতির পর।

গোপন আলোচনার জন্য হামাস ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা সমবেত হন শারম এল শেখ-এর একটি সম্মেলন কেন্দ্রে। সেখানে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং আঞ্চলিক প্রভাবশালী নেতাদের উপস্থিতি হামাসকে কিছুটা নিশ্চয়তা দেয়।

হামাসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্পের আগ্রহ সম্মেলন কেন্দ্রে ভারীভাবে অনুভূত হচ্ছিল।’ ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তিনবার ফোন করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ও দূত স্টিভ উইটকফ দোহা ও তেল আবিবের মধ্যে বারবার যাতায়াত করছিলেন।

ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে অস্ত্রবিরতি হলেও ভবিষ্যতের ধাপগুলো বাস্তবায়ন হবে কিনা—তা নিশ্চিত নয়। তবে কাতারে হামলার পর এবং ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি নিয়ে তার ভূমিকা হামাসকে কিছুটা ভরসা দেয় যে, এবার তিনি যুদ্ধ ফের শুরু হতে দেবেন না।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তিনি নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন কাতার হামলার জন্য এবং সেটিকেই কাজে লাগিয়ে তিনি ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করেন।

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি—ইসরায়েল কাতারকে আবার আক্রমণ করবে না—এটি হামাস ও অন্য আঞ্চলিক পক্ষগুলোর কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। গাজার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি কাতারকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন, এটা হামাসের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।’

হামাস লক্ষ্য করে ট্রাম্পের প্রকাশ্য নির্দেশনা—ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ থামাতে উভয় পক্ষকে তিনি থামতে বলেন। তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েলি বিমানগুলোকে “ফিরে যেতে বলার” ঘটনাও তাদের নজরে আসে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত আলোচনা অচল অবস্থায় ছিল। ইসরায়েলি সেনা কত দূর ও কত দ্রুত গাজা ছাড়বে—এই প্রশ্নে মতপার্থক্য ছিল। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আল থানি সরাসরি শারম এল শেখে পৌঁছান আলোচনা এগিয়ে নিতে। বুধবার সকালে কুশনার ও উইটকফও এসে পৌঁছান।

আলোচনায় তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিনের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে এই আলোচনায় সাহায্যের অনুরোধ পেয়েছিলেন।

হামাস দুই বছর ধরে বলে আসছিল, তারা জিম্মিদের ছাড়বে শুধু যদি ইসরায়েল পুরোপুরি গাজা থেকে সরে যায়। অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করে, তারা যুদ্ধ থামাবে তখনই, যখন সব জিম্মি ফিরে আসবে এবং হামাস নিশ্চিহ্ন হবে।

এই চুক্তিতে কেউ পুরোপুরি নিজের মতো জিতে যায়নি। ইসরায়েল গাজার অর্ধেক এলাকায় থেকে যাবে, হামাসও অস্তিত্ব হারাবে না। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় হামাসকে অস্ত্র ত্যাগের যে শর্ত ছিল, তা পরবর্তী পর্যায়ের জন্য রাখা হয়েছে।

আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে, যখন হামাস বুঝতে পারে, জিম্মিদের ধরে রাখা এখন আর লাভ নয়, বরং তাদের পক্ষে বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে হামাস কোনো লিখিত চুক্তি পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারী মিশর, কাতার ও তুরস্কের মৌখিক আশ্বাসের উপর তারা ভরসা রেখেছে—যে ট্রাম্প চুক্তি টিকিয়ে রাখবেন এবং ইসরায়েলকে ফের আগ্রাসন করতে দেবেন না।

হামাসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এই চুক্তিই যুদ্ধের ইতি।’

তবে তারা জানে, সিদ্ধান্ত উল্টোও যেতে পারে। জানুয়ারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে ট্রাম্প আবার হুমকি দিতে পারেন—‘সব জিম্মি একসঙ্গে না ছাড়লে, চুক্তি বাতিল হবে।’

সেই চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর যুদ্ধ চলেছে আরও বহুদিন। গাজায় প্রাণ গেছে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে বলে জানায় আন্তর্জাতিক সংস্থা।

এই চুক্তিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। এক কূটনীতিক বলেন, হামাস বা তার মিত্ররা হামলা চালালে ইসরায়েল ফের আক্রমণ করতে পারে।

তবু হামাসের এক নেতা মনে করেন, এবার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। ইসরায়েলও যেন আলোচনায় আন্তরিকতা দেখিয়েছে। মিশর, কাতার, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উভয় পক্ষকে কাছাকাছি এনেছে।

রবিবার ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের কথা রয়েছে। একজন সূত্র একে ‘চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে’ বলে উল্লেখ করেন। মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসির আমন্ত্রণে এই সফর হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র: রয়টার্স

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন